
পৌষের কনকনে ঠাণ্ডা হিমেল বাতাসে দোল খাচ্ছে দিগন্তজোড়া সরিষার হলুদ ফুল। ভোরের শিশিরভেজা মাঠে সূর্যের আলো পড়তেই যেন সোনালি রঙে ঝলমল করে ওঠে পুরো প্রান্তর। চোখ জুড়ানো এই দৃশ্যের আড়ালে চলছে আরেক নীরব অথচ ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ—মধু সংগ্রহ। সরিষার ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে ছুটে বেড়াচ্ছে লক্ষ লক্ষ মৌমাছি, আর সেই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে অর্থনীতির সম্ভাবনার নতুন গল্প।
চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জ জেলায় সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০৪ টন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে জেলার ৯টি উপজেলায় সরিষা ক্ষেতের পাশে পাঁচ শতাধিক মৌচাষি স্থাপন করেছেন তাদের মৌবাক্স। মাঠে মাঠে সারি সারি মৌবাক্স এখন জেলার গ্রামীণ দৃশ্যপটের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
সিরাজগঞ্জ সদর, কাজীপুর, শাহজাদপুর, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, তাড়াশসহ বিভিন্ন উপজেলায় গেলে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেতের কিনারায় সারিবদ্ধ মৌবাক্স। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর থাকে পুরো এলাকা। মৌচাষিরা জানান, সরিষা ফুলে নেকটারের পরিমাণ বেশি থাকায় এই মৌসুমটি মধু উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
মৌচাষি আব্দুল কাদের বলেন, “সরিষা ফুলের মধু খুবই উন্নত মানের হয় এবং এর বাজার চাহিদাও বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আমরা ভালো উৎপাদনের আশা করছি। এতে আমাদের আয় বাড়ার পাশাপাশি নতুন মৌচাষিরাও উৎসাহিত হবে।”
অন্য মৌচাষিরাও জানান, সরিষা মৌসুমে এক একটি মৌবাক্স থেকে তুলনামূলক বেশি মধু সংগ্রহ করা সম্ভব হয়, যা তাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করে। দ্বিমুখী সুফল মধু উৎপাদনের পাশাপাশি বাড়ছে সরিষার ফলন।
কৃষি বিভাগ বলছে, মৌচাষ শুধু মধু উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে সরিষা চাষেও মিলছে বড় ধরনের সুফল। মৌমাছির পরাগায়নের কারণে সরিষার ফলন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ফলে একদিকে যেমন মৌচাষিরা মধু সংগ্রহ করে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে কৃষকরাও পাচ্ছেন বেশি ফলন ও আর্থিক সুবিধা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জ জেলায় প্রায় ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এই বিশাল সরিষা ক্ষেত থেকেই ৪০৪ টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত- কৃষি কর্মকর্তারা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে মৌচাষ সম্প্রসারণ করা গেলে সিরাজগঞ্জ জেলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। শুধু কাঁচা মধু নয়, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, বোতলজাতকরণ ও সঠিক বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত থেকে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।
জেলা কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “মধু উৎপাদন একটি সম্ভাবনাময় কৃষি-সহায়ক খাত। সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে সিরাজগঞ্জ মধু উৎপাদনের অন্যতম বড় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।”
চ্যালেঞ্জও কম নয়- তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহার মৌমাছির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এছাড়া আবহাওয়ার বিরূপতা, অতিবৃষ্টি বা শৈত্যপ্রবাহ মধু উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে মৌচাষিদের মধ্যে।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ মৌচাষি ও কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানো, নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
আশার মৌসুম সব মিলিয়ে সরিষার হলুদ মাঠ আর মৌমাছির গুঞ্জনে সিরাজগঞ্জে তৈরি হয়েছে এক আশাব্যঞ্জক দৃশ্যপট। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অর্জিত হলে কৃষক ও মৌচাষি—উভয়ের জীবনেই আসবে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। একই সঙ্গে দেশের মধু উৎপাদন খাতে যুক্ত হবে সিরাজগঞ্জের নতুন এক সাফল্যের অধ্যায়।
অনলাইন ডেস্ক 






















