০১:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি

বিদ্যুতের দামে বড় লাফ, জীবনযাত্রার ব্যয়ে বাড়তি চাপ

  • অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৩:৫১:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
  • ২৪ Time View

সংগৃহিত

মধ্যবিত্তের বাড়ল ২০ শতাংশ, প্রান্তিক পর্যায়ে ১৫ * ইউনিটপ্রতি বেড়েছে ১.৫২ টাকার বেশি, কার্যকর চলতি মাসেই


দুই ধাপে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর এবার এক লাফে বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার; যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিইআরসির নতুন ঘোষণায় প্রান্তিক বা লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ এবং মধ্যবিত্তের ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ইউনিটপ্রতি গড় দাম বেড়েছে ১ টাকা ৫২ পয়সার বেশি। চলতি মাস থেকেই নতুন এই দাম কার্যকর হবে। এতে বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি নিত্যপণ্য, যাতায়াত, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে খরচের বড় ধাক্কা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাঁধে পড়তে যাচ্ছে। ফলে আগে থেকেই মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

Advertisement

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ৩ মে দেশের সব বিতরণ কোম্পানি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি এবং মতামত নিয়ে এক মাসের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘটনা বিইআরসিতে আগে কখনো ঘটেনি। তবে পিডিবি বলছে, তারা লাইফলাইন গ্রাহকদের (প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের মানুষ) বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে কোনো ধরনের প্রস্তাব করেনি। বিইআরসি নিজে থেকেই এই দাম বাড়িয়েছে। এতে করে ক্ষুব্ধ হতে পারে সাধারণ মানুষ, চাপে পড়তে পারে সরকার। পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য বিইআরসির কাছে পুনরায় প্রস্তাব পাঠানো হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, কমিশন যাচাই-বাছাই করেই লাইফলাইন গ্রাহকদের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন কমিশন নতুন প্রস্তাব পেলে সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বুধবার বিকালে তাদের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির ফলে আগামী অর্থবছরে পিডিবির লোকসান হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধির ফলে পিডিবির আয় বাড়বে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বাকি ৪১ হাজার কোটি টাকা সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে।

এদিন একই সঙ্গে বিতরণ কোম্পানিগুলোর জন্য পাইকারি বিদ্যুৎ এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবির জন্য হুইলিং চার্জও বাড়িয়েছে বিইআরসি। সংস্থাটি জানিয়েছে, সবশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল ৫ শতাংশের মতো। তবে এক লাফে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০১১ সালে। এরপর এবার ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়াল সরকার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ম তামিম যুগান্তরকে বলেছেন, এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এতে করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। বিইআরসির আরও যাচাই-বাছাই করা দরকার ছিল। বিশেষ করে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমানো এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে খরচ কমিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে দেশের জন্য ভালো হতো। তখন এত দাম বাড়ানোর দরকার হতো না। তিনি বলেন, এখন শিল্পকারখানাগুলোর বেশ ক্ষতি হবে।

বিইআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লাইফলাইন গ্রাহক অর্থাৎ শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহাকারীকে প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ৬৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৩২ টাকা, শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ৫ দশমিক ২৬ টাকা থেকে ৬ দশমিক ১৮ টাকা, ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ৭ দশমিক ২০ টাকা থেকে ৮ দশমিক ৫০ টাকা, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ৭ দশমিক ৫৯ টাকা থেকে ৯ দশমিক ১০ টাকা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ৮ দশমিক ০২ টাকা থেকে ৯ দশমিক ৬২ টাকা, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ১২ দশমিক ৬৭ টাকা থেকে ১৫ দশমিক ০১ টাকা এবং ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে ব্যবহারকারী গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১৪ দশমিক ৬১ টাকা থেকে ১৭ দশমিক ৩৫ টাকা করা হয়েছে। গ্রাহক ভেদে সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বাসাবাড়িতে এসি ব্যবহারকারীদের বিদ্যুতের দাম। বিইআরসি জানিয়েছে, সাধারণ গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট গড়ে ৯ দশমিক ১১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে। তবে পিডিবি দাবি করেছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিতরণে তাদের খরচ হয় প্রায় ১৩ টাকা।

ক্ষুদ্র শিল্পে ফ্ল্যাট ১০ দশমিক ৭৬ টাকা থেকে ১২ দশমিক ৭৩ টাকা; শিক্ষা, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং হাসাপাতালে ৭ দশমিক ৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট করা হয়েছে ৯ দশমিক ০৫ টাকা। ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনে ৯ দশমিক ৬২ টাকা থেকে ১১ দশমিক ৩৬ টাকা, বাণিজ্যিক ও অফিস ১৩ দশমিক ০১ টাকা থেকে ১৫ দশমিক ৩৬ টাকা করা হয়েছে। শিল্পে (৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত) ফ্ল্যাট ১০ দশমিক ৮৮ টাকা থেকে ১২ দশমিক ৮৫ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে উচ্চ ও অতি উচ্চ শিল্প গ্রাহকদের (মাঝারি ও ভারী শিল্প) বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। যদিও গণশুনানিতে সব খাতের শিল্পমালিকরা বিশেষ করে বস্ত্র ও ইস্পাত শিল্পের মালিকরা বলেছিলেন, ব্যবসা বাণিজ্যের অবস্থা বেশ খারাপ। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ালে ব্যবসা একেবারে হুমকির মুখে পড়বে।

এদিকে, পিজিসিবির হুইলিং চার্জ প্রতি ইউনিট ৩১ পয়সা থেকে ৩৯ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। বিতরণ কোম্পানির জন্য পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। তবে সাধারণ গ্রাহকদের ডিমান্ড চার্জ বাড়ানো হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের দাম কেন খুব দ্রুততার সঙ্গে বাড়ানো হলো এই প্রশ্নের জবাবে কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, বাজেট ঘোষণা হবে শিগগির। এর আগে সঙ্গত কারণেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কী পরিমাণে প্রভাব পড়বে এর কোনো আর্থিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে কিনা এর জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, এ ব্যাপারে কোনো অর্থনীতিবিদের পরামর্শ নেওয়া হয়নি। তবে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে।

ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়ছে ভয়াবহভাবে : বিইআরসি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের বড় ফাঁদ হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। ২০১১-১২ সালে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল মাত্র ৫ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। সেটি ২০২৪-২৫ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৫২ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।

ব্যয়ের বোঝা আরও ভারী হচ্ছে ভোক্তার : দুই ধাপে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির নতুন বোঝা চাপানো হয়েছে ভোক্তার কাঁধে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, দুই ধাপে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে পরিবহণ খরচ থেকে শুরু করে খাবার খরচ এমনকি সব ধরনের সেবার দাম বেড়েছে। যার ধকল কাটিয়ে উঠতে পারছি না। এর মধ্যে বিদ্যুতের নতুন বাড়তি দামের কারণে আবারও সব ধরনের খরচ বাড়বে।

কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. মকবুল বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লন্ড্রির দোকানে পোশাকপ্রতি ২ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন করে সব জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। এমনিতেই নিত্যপণ্যের দামে দিশেহারা আমরা। ব্যয় কমাতে খাবারে টান পড়ছে। এরমধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো কোনোমতেই ঠিক হয়নি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, দুর্নীতি ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বৃদ্ধি করার কারণে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। যদি দুর্নীতি ও লুণ্ঠন কমানো যায় তাহলে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে না। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে কষ্টে আছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়লে পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হবে।

Tag :
এখন আলোচনায়

বিদ্যুতের দামে বড় লাফ, জীবনযাত্রার ব্যয়ে বাড়তি চাপ

১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি

বিদ্যুতের দামে বড় লাফ, জীবনযাত্রার ব্যয়ে বাড়তি চাপ

আপডেট সময় : ০৩:৫১:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

মধ্যবিত্তের বাড়ল ২০ শতাংশ, প্রান্তিক পর্যায়ে ১৫ * ইউনিটপ্রতি বেড়েছে ১.৫২ টাকার বেশি, কার্যকর চলতি মাসেই


দুই ধাপে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর এবার এক লাফে বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার; যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিইআরসির নতুন ঘোষণায় প্রান্তিক বা লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ এবং মধ্যবিত্তের ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ইউনিটপ্রতি গড় দাম বেড়েছে ১ টাকা ৫২ পয়সার বেশি। চলতি মাস থেকেই নতুন এই দাম কার্যকর হবে। এতে বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি নিত্যপণ্য, যাতায়াত, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে খরচের বড় ধাক্কা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাঁধে পড়তে যাচ্ছে। ফলে আগে থেকেই মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

Advertisement

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ৩ মে দেশের সব বিতরণ কোম্পানি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি এবং মতামত নিয়ে এক মাসের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘটনা বিইআরসিতে আগে কখনো ঘটেনি। তবে পিডিবি বলছে, তারা লাইফলাইন গ্রাহকদের (প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের মানুষ) বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে কোনো ধরনের প্রস্তাব করেনি। বিইআরসি নিজে থেকেই এই দাম বাড়িয়েছে। এতে করে ক্ষুব্ধ হতে পারে সাধারণ মানুষ, চাপে পড়তে পারে সরকার। পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য বিইআরসির কাছে পুনরায় প্রস্তাব পাঠানো হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, কমিশন যাচাই-বাছাই করেই লাইফলাইন গ্রাহকদের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন কমিশন নতুন প্রস্তাব পেলে সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বুধবার বিকালে তাদের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির ফলে আগামী অর্থবছরে পিডিবির লোকসান হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধির ফলে পিডিবির আয় বাড়বে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বাকি ৪১ হাজার কোটি টাকা সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে।

এদিন একই সঙ্গে বিতরণ কোম্পানিগুলোর জন্য পাইকারি বিদ্যুৎ এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবির জন্য হুইলিং চার্জও বাড়িয়েছে বিইআরসি। সংস্থাটি জানিয়েছে, সবশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল ৫ শতাংশের মতো। তবে এক লাফে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০১১ সালে। এরপর এবার ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়াল সরকার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ম তামিম যুগান্তরকে বলেছেন, এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এতে করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। বিইআরসির আরও যাচাই-বাছাই করা দরকার ছিল। বিশেষ করে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমানো এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে খরচ কমিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে দেশের জন্য ভালো হতো। তখন এত দাম বাড়ানোর দরকার হতো না। তিনি বলেন, এখন শিল্পকারখানাগুলোর বেশ ক্ষতি হবে।

বিইআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লাইফলাইন গ্রাহক অর্থাৎ শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহাকারীকে প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ৬৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৩২ টাকা, শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ৫ দশমিক ২৬ টাকা থেকে ৬ দশমিক ১৮ টাকা, ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ৭ দশমিক ২০ টাকা থেকে ৮ দশমিক ৫০ টাকা, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ৭ দশমিক ৫৯ টাকা থেকে ৯ দশমিক ১০ টাকা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ৮ দশমিক ০২ টাকা থেকে ৯ দশমিক ৬২ টাকা, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট ১২ দশমিক ৬৭ টাকা থেকে ১৫ দশমিক ০১ টাকা এবং ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে ব্যবহারকারী গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১৪ দশমিক ৬১ টাকা থেকে ১৭ দশমিক ৩৫ টাকা করা হয়েছে। গ্রাহক ভেদে সর্বনিম্ন ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বাসাবাড়িতে এসি ব্যবহারকারীদের বিদ্যুতের দাম। বিইআরসি জানিয়েছে, সাধারণ গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট গড়ে ৯ দশমিক ১১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে। তবে পিডিবি দাবি করেছে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিতরণে তাদের খরচ হয় প্রায় ১৩ টাকা।

ক্ষুদ্র শিল্পে ফ্ল্যাট ১০ দশমিক ৭৬ টাকা থেকে ১২ দশমিক ৭৩ টাকা; শিক্ষা, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং হাসাপাতালে ৭ দশমিক ৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট করা হয়েছে ৯ দশমিক ০৫ টাকা। ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনে ৯ দশমিক ৬২ টাকা থেকে ১১ দশমিক ৩৬ টাকা, বাণিজ্যিক ও অফিস ১৩ দশমিক ০১ টাকা থেকে ১৫ দশমিক ৩৬ টাকা করা হয়েছে। শিল্পে (৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত) ফ্ল্যাট ১০ দশমিক ৮৮ টাকা থেকে ১২ দশমিক ৮৫ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে উচ্চ ও অতি উচ্চ শিল্প গ্রাহকদের (মাঝারি ও ভারী শিল্প) বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। যদিও গণশুনানিতে সব খাতের শিল্পমালিকরা বিশেষ করে বস্ত্র ও ইস্পাত শিল্পের মালিকরা বলেছিলেন, ব্যবসা বাণিজ্যের অবস্থা বেশ খারাপ। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ালে ব্যবসা একেবারে হুমকির মুখে পড়বে।

এদিকে, পিজিসিবির হুইলিং চার্জ প্রতি ইউনিট ৩১ পয়সা থেকে ৩৯ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। বিতরণ কোম্পানির জন্য পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। তবে সাধারণ গ্রাহকদের ডিমান্ড চার্জ বাড়ানো হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের দাম কেন খুব দ্রুততার সঙ্গে বাড়ানো হলো এই প্রশ্নের জবাবে কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, বাজেট ঘোষণা হবে শিগগির। এর আগে সঙ্গত কারণেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কী পরিমাণে প্রভাব পড়বে এর কোনো আর্থিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে কিনা এর জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, এ ব্যাপারে কোনো অর্থনীতিবিদের পরামর্শ নেওয়া হয়নি। তবে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে।

ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়ছে ভয়াবহভাবে : বিইআরসি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের বড় ফাঁদ হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। ২০১১-১২ সালে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল মাত্র ৫ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। সেটি ২০২৪-২৫ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৫২ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।

ব্যয়ের বোঝা আরও ভারী হচ্ছে ভোক্তার : দুই ধাপে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির নতুন বোঝা চাপানো হয়েছে ভোক্তার কাঁধে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, দুই ধাপে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে পরিবহণ খরচ থেকে শুরু করে খাবার খরচ এমনকি সব ধরনের সেবার দাম বেড়েছে। যার ধকল কাটিয়ে উঠতে পারছি না। এর মধ্যে বিদ্যুতের নতুন বাড়তি দামের কারণে আবারও সব ধরনের খরচ বাড়বে।

কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. মকবুল বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লন্ড্রির দোকানে পোশাকপ্রতি ২ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন করে সব জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। এমনিতেই নিত্যপণ্যের দামে দিশেহারা আমরা। ব্যয় কমাতে খাবারে টান পড়ছে। এরমধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো কোনোমতেই ঠিক হয়নি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, দুর্নীতি ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বৃদ্ধি করার কারণে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। যদি দুর্নীতি ও লুণ্ঠন কমানো যায় তাহলে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে না। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে কষ্টে আছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়লে পণ্য ও সেবার উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হবে।