
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উইকেয়ার ফেজ-১-এর আওতায় ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক (এন-৭) ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও ধীরগতির কারণে নির্মাণকাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। উল্টো মহাসড়কজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি ও খানাখন্দের কারণে জনভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে।
চলতি বছরের ডিসেম্বরেই প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। প্রথম লটে অগ্রগতি প্রায় ১০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় লটে মাত্র ২ শতাংশ। ফলে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিসেম্বর ২০২৬-এর পর বিশ্বব্যাংক আর অর্থায়ন করবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা কালীগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং ঝিনাইদহ সদর এলাকায় প্রায় ৫০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে। প্রশাসনিক সহায়তা ও জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পরও নির্মাণকাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
প্রকল্পের ধীরগতির জন্য শুরুতে জমি অধিগ্রহণকে দায়ী করা হলেও বর্তমানে মূল অভিযোগের তীর লট-২ ও ৩-এর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনায়েম লিমিটেড এবং লট-১-এর দায়িত্বে থাকা ম্যাক্স (এলআর বিসি-মিল জেভি, চীন)-এর স্থানীয় প্রতিনিধিদের দিকে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় জমি পাওয়ার পরও তারা কাজ এগিয়ে নিতে চরম গড়িমসি করছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, জমি অধিগ্রহণে সরকারের ছয়টি বিভাগের সমন্বয় প্রয়োজন হওয়ায় জরিপ ও পরিদর্শন প্রতিবেদনে বিলম্ব হয়েছিল। এতে শুরুতে অধিগ্রহণের গতি কিছুটা কম থাকলেও বর্তমানে জেলা প্রশাসন দ্রুতগতিতে জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করছে।
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুবীর কুমার দাশ বলেন, ‘আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজ ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। বরং দ্রুততার সঙ্গে কাজ এগিয়ে চলছে। প্রকল্পটি যাতে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে সহায়ক হয়, সেভাবেই আমরা অধিগ্রহণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও ধীরগতির কারণে নির্মাণকাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও ধীরগতির কারণে নির্মাণকাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।লট-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী নিলন আলী বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণে ধীরগতির কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সময়মতো কাজ শুরু করতে পারেনি। মার্চ ও জুলাই মাসে আমরা বেশ কিছু জমি বুঝে পেয়েছি। এখন কাজের গতি বাড়বে।’
তিনি তাদের কাজ ১০ শতাংশের মতো এগিয়েছে দাবি করে বলেন, ‘আগামী সপ্তাহ থেকে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কাজ শুরু হবে বলে আশা করছি।’
অন্যদিকে, লট-২ ও ৩-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন বলেন, ‘চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কোনোভাবেই প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে জমি পাওয়ার পরও ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে এখন পর্যন্ত মাত্র ২ শতাংশ কাজ হয়েছে। কাজের গতি বাড়াতে বারবার তাগিদ ও চিঠি দেওয়া হলেও তারা কোনো তোয়াক্কা করছে না।’
সড়কজুড়ে ধীরগতির নির্মাণকাজে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ। ভোমরা, বেনাপোল ও মোংলা বন্দর থেকে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান সড়ক এটি। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা খুঁড়ে ফেলে রাখায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বসির উদ্দীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুনেছি জেলা প্রশাসন জমি অধিগ্রহণ করে বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার ও তাদের প্রতিনিধির খামখেয়ালিপনায় পুরো সড়ক এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। গর্তের কারণে যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় মুমূর্ষু রোগীকেও সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে।’
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় উইকেয়ার ফেজ-১ প্রকল্পটি ঝিনাইদহ থেকে যশোরের চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত ৪৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চারটি প্রধান লেন ও দুটি সার্ভিস লেনসহ মোট ছয় লেনে উন্নীত করার কথা। ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর একনেক সভায় অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৭৮৭ কোটি এবং বাংলাদেশ সরকারের এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের মূল মেয়াদ ধরা হয় ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পটি তিনটি লটে ভাগ করা হয়। প্রথম লটের কাজ করছে ম্যাক্স (এলআর বিসি-মিল জেভি, চীন), আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় লটের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনায়েম লিমিটেড (এএমএল-ওটিসিজি জেভি)।
তবে, কাজ না করেই ২০২৫ সালের ৭ মে দ্বিতীয় দফায় ডিপিপি সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৬২৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে কাজের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের ডিভিশনাল ডিরেক্টর জোঁ পেম এবং অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন গত ১৯ জুলাই ঝিনাইদহ সফরে গিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। সে সময় তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই প্রকল্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রকল্পের কাজের ধীরগতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে ঝিনাইদহ-যশোর ছয় লেন প্রকল্প এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত নির্মাণকাজে গতি না এলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইউএনবি 























