০৬:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ত্রিমুখী চাপে বেকায়দায় জামায়াত

  • কালেরকণ্ঠ
  • আপডেট সময় : ০৪:৪২:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
  • ১০ Time View

ইতিহাসে প্রথমবার জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু নতুন এ রাজনৈতিক উচ্চতায় ওঠার কয়েক মাসের মধ্যেই একের পর এক বিতর্কে বেকায়দায় পড়েছে দলটি। সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত ভিডিওকাণ্ড, সরকারি বরাদ্দে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এবং জোট রাজনীতিতে টানাপোড়েন—এ তিন ইস্যু এখন একসঙ্গে চাপ তৈরি করেছে জামায়াতের ওপর।

আগামীর সময় এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করে, প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর জনআকাঙ্ক্ষা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে জনপর্যবেক্ষণও। ফলে আগে যেসব ঘটনা সীমিত পরিসরে থাকত, এখন সেগুলো বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হচ্ছে। আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে সংসদকেন্দ্রিক বিরোধী দলের ভূমিকায় এসে নতুন বাস্তবতার চাপ সামলানোর পরীক্ষায় পড়েছে জামায়াত।

সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতদলীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি। আদর্শিক ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দ্রুতই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। জামায়াতের রাজনীতিতে নারী-সম্পর্কিত এমন বড় বিতর্কে কোনো নেতার নাম প্রকাশ্যে আসার ঘটনা এটিই প্রথম।
দলীয় সূত্র বলছে, ঘটনাটিকে শুধু ব্যক্তিগত বিচ্যুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে না; এর আইনগত, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও মূল্যায়ন করছে নেতৃত্ব।

এর আগে সরকারি অনুদান ও ত্রাণ বিতরণে কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সামনে আসার পর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষরে সব সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত নির্দেশনা পাঠানো হয়। নির্দেশনায় সরকারি অনুদান, ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ), ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) কিংবা তাদের স্বজনদের জন্য কোনো ধরনের সুপারিশ বা বরাদ্দ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থানীয় পর্যায়েও সরকারি বরাদ্দে অনিয়ম, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগে একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সংসদের বাইরেও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে জোট রাজনীতিতে। হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমিভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের আলোচনা শুরুর পর ১১-দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেছে খেলাফত মজলিস। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আরও কয়েকটি দলের অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জামায়াতের নেতাদের একটি অংশের দাবি, তাদের নেতৃত্বাধীন জোটকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যেই কওমি ধারার দলগুলোকে আলাদা করার চেষ্টা চলছে।

দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও ধারাবাহিকভাবে এমন বিতর্ক তৈরি হলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দলের নৈতিক ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রুকন সম্মেলনে জামায়াত আমির নেতাকর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—জনপ্রতিনিধি বা নেতাদের কোনো আচরণ যেন দলের আদর্শ ও জনগণের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে। তিনি বলেন, ‘ভেরি কেয়ারফুল। নৈতিকতার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীতে কোনো ছাড় নেই।’ একই সঙ্গে তিনি নেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন, ‘সাদা কাপড়ে দাগ লাগলে তা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।’

জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, ‘প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। অন্য দলের ক্ষেত্রে যেটি ছোট ঘটনা, আমাদের ক্ষেত্রে সেটিই বড় বিতর্ক হয়ে যায়। কিছু ঘটনায় আমরা বিব্রত হয়েছি। বিশেষ করে গাজী নজরুলের ঘটনাটি দলের জন্য বড় ইমেজ সংকট তৈরি করেছে।’

লটির নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো রাজনৈতিকভাবে দলের জন্য অস্বস্তিকর। জনগণের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আরও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিতর্ক এড়াতে কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘জামায়াত প্রথমবারের মতো বড় সংসদীয় শক্তি হয়েছে। ফলে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন জনপর্যবেক্ষণে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই এখন দলটিকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’

Tag :
এখন আলোচনায়

ত্রিমুখী চাপে বেকায়দায় জামায়াত

আপডেট সময় : ০৪:৪২:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

ইতিহাসে প্রথমবার জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু নতুন এ রাজনৈতিক উচ্চতায় ওঠার কয়েক মাসের মধ্যেই একের পর এক বিতর্কে বেকায়দায় পড়েছে দলটি। সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত ভিডিওকাণ্ড, সরকারি বরাদ্দে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এবং জোট রাজনীতিতে টানাপোড়েন—এ তিন ইস্যু এখন একসঙ্গে চাপ তৈরি করেছে জামায়াতের ওপর।

আগামীর সময় এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করে, প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর জনআকাঙ্ক্ষা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে জনপর্যবেক্ষণও। ফলে আগে যেসব ঘটনা সীমিত পরিসরে থাকত, এখন সেগুলো বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হচ্ছে। আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে সংসদকেন্দ্রিক বিরোধী দলের ভূমিকায় এসে নতুন বাস্তবতার চাপ সামলানোর পরীক্ষায় পড়েছে জামায়াত।

সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতদলীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি। আদর্শিক ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দ্রুতই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। জামায়াতের রাজনীতিতে নারী-সম্পর্কিত এমন বড় বিতর্কে কোনো নেতার নাম প্রকাশ্যে আসার ঘটনা এটিই প্রথম।
দলীয় সূত্র বলছে, ঘটনাটিকে শুধু ব্যক্তিগত বিচ্যুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে না; এর আইনগত, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও মূল্যায়ন করছে নেতৃত্ব।

এর আগে সরকারি অনুদান ও ত্রাণ বিতরণে কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সামনে আসার পর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষরে সব সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত নির্দেশনা পাঠানো হয়। নির্দেশনায় সরকারি অনুদান, ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ), ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) কিংবা তাদের স্বজনদের জন্য কোনো ধরনের সুপারিশ বা বরাদ্দ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থানীয় পর্যায়েও সরকারি বরাদ্দে অনিয়ম, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগে একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সংসদের বাইরেও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে জোট রাজনীতিতে। হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমিভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের আলোচনা শুরুর পর ১১-দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেছে খেলাফত মজলিস। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আরও কয়েকটি দলের অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জামায়াতের নেতাদের একটি অংশের দাবি, তাদের নেতৃত্বাধীন জোটকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যেই কওমি ধারার দলগুলোকে আলাদা করার চেষ্টা চলছে।

দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও ধারাবাহিকভাবে এমন বিতর্ক তৈরি হলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দলের নৈতিক ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রুকন সম্মেলনে জামায়াত আমির নেতাকর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—জনপ্রতিনিধি বা নেতাদের কোনো আচরণ যেন দলের আদর্শ ও জনগণের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে। তিনি বলেন, ‘ভেরি কেয়ারফুল। নৈতিকতার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীতে কোনো ছাড় নেই।’ একই সঙ্গে তিনি নেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন, ‘সাদা কাপড়ে দাগ লাগলে তা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।’

জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, ‘প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। অন্য দলের ক্ষেত্রে যেটি ছোট ঘটনা, আমাদের ক্ষেত্রে সেটিই বড় বিতর্ক হয়ে যায়। কিছু ঘটনায় আমরা বিব্রত হয়েছি। বিশেষ করে গাজী নজরুলের ঘটনাটি দলের জন্য বড় ইমেজ সংকট তৈরি করেছে।’

লটির নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো রাজনৈতিকভাবে দলের জন্য অস্বস্তিকর। জনগণের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আরও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিতর্ক এড়াতে কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘জামায়াত প্রথমবারের মতো বড় সংসদীয় শক্তি হয়েছে। ফলে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন জনপর্যবেক্ষণে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই এখন দলটিকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’