
আধুনিকতার ছোঁয়ায় নানা দূষণ আর কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় জোনাকিদের অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে
এক সময় সন্ধ্যা হলেই জনপদের ঝোঁপঝাড়ে দেখা যেত শরীরে পিদিম জ্বালিয়ে মিটমিট করে জ্বলা জোনাকি পোকার ওড়াউড়ির দৃশ্য। তা দেখে ছোটবেলায় বন্ধুরা মিলে জোনাকির পেছনে দৌড়াতাম। হাতের মুঠোয় নিয়ে আবার উড়িয়ে দিতাম। উল্টেপাল্টে দেখতাম, কীভাবে একটি পোকার পেট থেকে আলো বের হয়! নিশ্চয়ই জোনাকি নিয়ে এমন কত স্মৃতিই হয়তো জমা আছে আমাদের স্মৃতিপটে। এখন আর জোনাকির পেছনে দৌড়ানো হয় না। হাতে নিয়ে দেখা হয় না। হয়তো বড় হয়েছি বলে। জোনাকি এক আকর্ষণীয় পোকা যা আমাদের রাতকে আলোকিত করে তোলে আর পরিবেশকেও করে তোলে সুন্দর ও রহস্যময়। অদ্ভুত এক ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে আসে জোনাকি। শৈশবের কত রঙিন রাতের স্মৃতি জুড়ে লেখা আছে জোনাকির নাম। শহুরে জীবনে এদের দেখা একটু কম মিললেও একসময় গ্রামে প্রায় প্রতি রাতে তারা চোখে পড়ত। সেই জোনাকিরা এখন অস্তিত্ব সংকটে।বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে গেয়েছিলেন, ‘ও জোনাকি, কী সুখে ওই ডানা দুটি মেলেছ/ আঁধার সাঁঝে বনের মাঝে উল্লাসে প্রাণ ঢেলেছ।’ আবার কবি আহসান হাবীব ‘জোনাকিরা’ কবিতায় লিখেছেন, ‘তারাÑএকটি দুটি তিনটি করে এলো/তখনÑবৃষ্টি-ভেজা শীতের হাওয়া/বইছে এলোমেলো/তারাÑএকটি দুটি তিনটি করে এলো।’মনে কি পড়ে রাতের অন্ধকারে গাছগাছালি, লতাপাতা, ঝোপঝাড় বা পুকুরপাড়ে পৃথিবীর বুকে তারার মতো জ্বলতে থাকা সেই ছোট্ট পোকাটির কথা! শৈশবের কোনো এক সন্ধ্যা বা রাতে বাবার বা দাদা-নানার হাতটি ধরে চলতে চলতে, অবাক বিস্ময়ে মনকে নাড়া দিয়ে যাওয়া সেই উড়ন্ত আলোর ঝলকানি। ঘুটঘুটে নিমেষ কালো অন্ধকারে যেন সাঁঝ দেবতা সেই উড়ন্ত আলোদের দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিল পথিককে পথ দেখানোর। আর তারাও যেন ঠিক সে দায়িত্ব একেবারে অক্ষরে-অক্ষরে পালন করেই চলেছে। এখন আর জোনাকির পেছনে দৌড়ানো হয় না। হাতে নিয়ে দেখা হয় না। হয়তো বড় হয়েছি বলে। কিন্তু এখনকার ছোট ছেলে-মেয়েরা কি জোনাকির পেছনে দৌড়ায়? হাতে নিয়ে আবার উড়িয়ে দেয়? এই প্রশ্নটা অত জরুরি না হলেও ‘আগের মতো আর জোনাকির দেখা পাওয়া যায় না কেন’Ñএটি একটি জরুরি প্রশ্ন।সত্যিই, আগের মতো আর জোনাকির দেখা মেলে না। শৈশবের সেই সন্ধ্যা যেন আর নামে না। আলোর মশাল জ্বেলে জোনাকিরা আর আসে না। ক্রমেই যেন নিভে যাচ্ছে জোনাকির আলো। কী এমন হলো, যে জোনাকির সংখ্যা হঠাৎ এত কমে যাচ্ছে?অনলাইন সূত্রে জানা গেছে, গবেষকরা জোনাকিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করছেন এবং বেশ কিছু কারণ খুঁজেও পেয়েছেন। সর্বশেষ ২০২০ সালে আমেরিকান জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক, লেখক এবং ফায়ারফ্লাই বিশেষজ্ঞ সারা মার্জারি লুইসের নেতৃত্বে একটি দল জোনাকিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাতে উঠে এসেছে বাসস্থান হারানো, আলো দূষণ ও কীটনাশকের ব্যবহারসহ বেশ কিছু কারণ।সারা লুইস বলেন, পৃথিবীতে এখন অনেক প্রাণীই তাদের বাসস্থান হারিয়ে বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। তেমনটি ঘটছে জোনাকিদের সঙ্গেও। জোনাকিদের জীবনচক্র সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ কিছু পরিবেশগত অবস্থার প্রয়োজন। এসব অবস্থা যখন জোনাকিরা হারিয়ে ফেলে, তখন পরবর্তী প্রজন্মে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে। মালয়েশিয়ায় এক প্রজাতির জোনাকি (Pteroptyx tener) রয়েছে, যারা ব্যতিক্রমী আলো প্রদর্শন করতে পারে। এই জোনাকিদের বসবাস ও প্রজননের জন্য ম্যানগ্রোভ বন দরকার। কিন্তু, মালয়েশিয়াতে ম্যানগ্রোভের জায়গায় পামওয়েল গাছ এবং কৃষি খামারের ব্যাপক বিস্তার ঘটায় এ প্রজাতির প্রজননে সমস্যা হচ্ছে। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যাও কমে আসছে। জীববিজ্ঞানীদের মতে, জোনাকিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে রাতের বেলায় অত্যধিক কৃত্রিম আলো বা আলো দূষণ। সারা লুইস ও তার দলের গবেষণায়ও বলা হয়েছে, পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ২৩ শতাংশেরও বেশি রাতের বেলায় কৃত্রিম আলোয় আলোকিত হয়। আর এ কৃত্রিম আলো জোনাকিদের বংশ বিস্তারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।আরও জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন বৈশ্বিক সমস্যা। এর প্রভাব পড়ছে প্রতিটি ক্ষেত্রেই। জোনাকিদের জন্যও জলবায়ু পরিবর্তন অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের বেঁচে থাকার জন্য আর্দ্র পরিবেশ দরকার। কিন্তু খরার কারণে সে পরিবেশ আর বজায় থাকছে না। এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, বরফাচ্ছন্ন এলাকার পরিবেশ পরিবর্তন হচ্ছে। এর বাইরে ঝড়, বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা তো রয়েছেই। এসব পরিবর্তন জোনাকিদের বাসস্থান, জৈবিক এবং যৌন জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ফলে জোনাকিরা পড়ে যাচ্ছে হুমকির মুখে।জোনাকিদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই জোনাকিদের বাসস্থান বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাদের বাসস্থান যেন ধ্বংস না হয়, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে জোনাকিদের বসবাস বা সংরক্ষণের জন্য আলাদা জোন তৈরির কথা ভাবতে হবে।জোনাকিরা অন্ধকারে থাকতে ভালোবাসে। আলোর কারণে তাদের প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এজন্য অপ্রয়োজনে সব জায়গা আলোকিত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজনে সন্ধ্যার দিকে বাড়ির বাইরের বাতি বন্ধ রাখতে হবে।কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে। বিশেষ করে যেসব কীটনাশক জোনাকিদের সরাসারি মৃত্যুর জন্য দায়ী, সেসব কীটনাশক নিষিদ্ধ করতে হবে। জৈব সার ব্যবহারের দিকে বেশি জোর দিতে হবে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জোনাকিদের বেশির ভাগ প্রজাতিই পুকুর বা জলাধারের পাশে পচা কাঠ এবং বনাঞ্চলে লার্ভা হিসেবে বেড়ে ওঠে। তাদের যেখানে জন্ম হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা সেখানেই অবস্থান করে। কিছু প্রজাতির জোনাকি জলের ধারে থাকতেই বেশি ভালোবাসে। আবার কিছু প্রজাতিকে দেখা যায় শুকনো অঞ্চলে। তবে বেশির ভাগেরই দেখা মেলে মাঠ, বন এবং জলাভূমিতে। বসবাসের জন্য উষ্ণ, আর্দ্র এবং জলজ পরিবেশ, যেমনÑঝোপঝাড়, পুকুর, নদী কিংবা জলধারা জোনাকিদের পছন্দের জায়গা। পাশাপাশি কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনকেও তারা দায়ীও করছেন।
এ এইচ কামরুল 






















