
এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এবং দেশের বৃহত্তম সরকারি চিনিকল, দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো ২০২৫-২০২৬ সালের ৮৮তম আখ মাড়াই মৌসুম।
৬২ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বিপুল বোঝা কাঁধে নিয়েও আশা ও চ্যালেঞ্জের মিশেলে শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) বিকেল ৪টায় মিলের কেইন ক্যারিয়ারে (Cane Carrier) আখ নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে নতুন মৌসুমের শুভ উদ্বোধন করা হয়।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই নতুন মাড়াই মৌসুমের উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনের আগে মিল প্রাঙ্গণে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চেয়ারম্যান ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রশিদুল হাসান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল হক। এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, এবং কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাব্বিক হাসান।
কেরু অ্যান্ড কোম্পানির দৈনিক আখ মাড়াই ক্ষমতা বর্তমানে ১ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন। মিল কর্তৃপক্ষ চলতি মৌসুমে আগের বারের চেয়ে উৎপাদন বাড়াতে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
সূচক বিগত মৌসুম (২০২৪-২৫) চলতি মৌসুম (২০২৫-২৬) – লক্ষ্মাত্রা
মাড়াইয়ের দিন ৬৪ দিন ৭২ দিন
আখ মাড়াই (মেট্রিক টন) ৭২, ২৩৫ মে. টন ৭৬,০০০ মে. টন
চিনি উৎপাদন (মেট্রিক টন) ৩,৬৮৫ মে. টন ৪,২৫৬ মে. টন
চিনি আহরণের হার (Recovery Rate) – ৫.৬০ শতাংশঐতিহ্যবাহী এই চিনিকলের আর্থিক চিত্র এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেরু অ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৮৮টি মৌসুমেই লোকসানে রয়েছে। বর্তমানে মিলের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকারও বেশি। বিপুল এই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ চলছে, যা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মিলজোনে আখ চাষের পরিমাণ কমে যাওয়া। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও আখ চাষ কমে যাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
মোট আখ চাষের জমি: ৫,৫৬২ একর
মিলের নিজস্ব খামার: ১,৬২৫ একর
চাষিদের জমি: ৩,৯৩৭ একরচাষিদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার প্রতি মণ (৪০ কেজি) আখের দাম ২৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে, আখচাষিরা এই মূল্য বৃদ্ধিতে সন্তুষ্ট নন। তাঁদের অভিযোগ, উৎপাদন ব্যয় ও খোলা বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও সেই তুলনায় আখের দাম বাড়েনি।
চাষিদের মতে, আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে কৃষকরা আরও বেশি করে আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এটি সরাসরি মিলের কাঁচামাল সরবরাহকে কমিয়ে দেবে, যা ঐতিহ্যবাহী এই চিনিকলের অস্তিত্বের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চিনি উৎপাদন, উপজাত পণ্য থেকে মুনাফা অর্জন এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে এই ঐতিহ্যবাহী সরকারি প্রতিষ্ঠানটিকে লোকসানের বৃত্ত থেকে বের করে আনা যায়, তা-ই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মোঃ নাঈম উদ্দীন স্টাফ রিপোর্টার, চুয়াডাঙ্গা। 





















