
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রথম ও সাহসী মেগা প্রকল্প হতে যাচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। গতকাল বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম ইশতেহার ছিল পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ। অবশেষে তা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার গঠনের তিন মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রকল্পটি অনুমোদন দিলেন তিনি। একনেক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২.১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসনে এটিই হচ্ছে সরকারের বড় উদ্যোগ।
একনেক সভায় উপস্থিত থাকা এক কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। একইসঙ্গে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী- এ পাঁচটি নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা হবে। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করার জন্য এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত কলকাতা বন্দরের নাব্য উন্নত করার জন্য ১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করে ভারত। ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমেছে এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল নদী শুকিয়ে গেছে।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রথম ধাপে ১৩৫.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গড়াই-মধুমতী নদী এবং ২৪৬.৪৬ কিলোমিটার হিসনা নদী ব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনর্খননের কাজও করা হবে। অন্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১৫টি স্পিলওয়েসহ গড়াই অফ-টেক, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও ৩৬.৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। পাশাপাশি চন্দনা অফ-টেকে চারটি স্পিলওয়ে, হিসনা অফ-টেকে পাঁচটি স্পিলওয়ে এবং ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে। প্রথম ধাপ বাস্তবায়িত হলে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অন্তত ১৯টি জেলা ও ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে। দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে। পদ্মা ব্যারাজের মোট প্রকল্প এলাকা বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা দেশের চারটি বিভাগের ২৬টি জেলার ১৬৩টি উপজেলায় বিস্তৃত। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১৯টি জেলায় এর প্রভাব পড়বে। জেলাগুলো হলো- খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা, ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ, রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলা।
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের আলোচনা ও দাবি সামনে আসে ষাটের দশকে। তারপর থেকে প্রকল্পটির সমীক্ষা হয়েছে কয়েকবার। কিন্তু প্রকল্পটির অনুমোদন ও বাস্তবায়নে এর আগে কোনো সরকারই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। গত অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষ পর্যন্ত বিরত থাকে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে এক জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। সরকার গঠনের পর তিনি এ প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যাননি। গত ৬ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় তারেক রহমান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করেন এবং সেই আলোচনায়ই সিদ্ধান্ত হয় অর্থনৈতিক পরিষদের পরবর্তী সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটির উপস্থাপন করা হবে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি ব্যাপক ব্যয়সাপেক্ষ, বিশাল ও বহুমুখী একটি প্রকল্প, যার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে দীর্ঘসময়ের প্রয়োজন হবে। প্রকল্পটির ব্যাপারে যেহেতু ভারতের ঘোর আপত্তি, তাই প্রতিবেশী দেশটি চাইবে প্রকল্প যাতে বাস্তবায়ন না হয়। সম্ভাব্য সব উপায়ে দেশটি পদ্মা ব্যারাজের বিরোধিতা করবে এবং বাধাদানের চেষ্টা করবে, সেটি সহজেই অনুমেয়। এ প্রেক্ষাপটে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত, সন্দেহ নেই।
একনেক সভায় অনুমোদিত অন্য প্রকল্প : একনেক সভায় অর্থ এবং পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ; শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির; সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম; সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী; স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন; আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান; পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকীসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সভা সূত্রে জানা যায়, মোট ১৬টি প্রকল্প সভায় উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ১১ নম্বর কার্যতালিকায় রাখা হয়েছিল পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। এ প্রকল্পসহ মোট ৯টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় একনেকের বৈঠকে। অনুমোদিত ৯টি প্রকল্পের মধ্যে নতুন প্রকল্প রয়েছে ৩টি, সংশোধিত প্রকল্প ৫টি ও মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয় ১টি প্রকল্পের। এসব প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হচ্ছে- চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন (২য় সংশোধন) প্রকল্প, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ (২য় সংশোধন) প্রকল্প। এ প্রকল্প দুটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জেলা শহরে বিদ্যমান মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে উন্নীতকরণ প্রকল্প। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাই-টেক সিটি-২-এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ (৩য় সংশোধন) প্রকল্প। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমণি নিবাস নির্মাণ (২য় সংশোধন) প্রকল্প। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সমস্যা নিরসনে ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড (পতেঙ্গা হতে সাগরিকা) (৫ম সংশোধিত) প্রকল্প। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পদ্মা ব্যারাজ (১ম পর্যায়) প্রকল্প। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ময়মনসিংহ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য ধনুয়া হতে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প (১ম সংশোধন) প্রকল্প।
অনলাইন ডেস্ক 























