
চুরি শব্দের সাথে অপরিচিত মানুষ পাওয়া যাবে না। গাড়ি চুরি, টাকা চুরি, থিসিস চুরি, ব্যাংকের টাকা চুরি, সরকারি অর্থ চুরি, ত্রাণসামগ্রী চুরি—এসবের কথা সবাই জানে। হাঁস-মুরগি, গরু চুরির কথাও শুনেছি। সুকুমার রায়ের বদৌলতে গোফ চুরির কথাও পড়েছি। সেই কবিতার কথা মনে হলে এখনো হাসি পায়। হৃদয় চুরির গল্পও কম নেই। কিন্তু মৌমাছি চুরির কথা কেউ কখনো শুনেছে? তাও আবার একটা-দুটো নয়। আনুমানিক ৮ লাখ মৌমাছি চুরি গেছে। আর এই চুরি হয়েছে অত্যাধুনিক কৌশলে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান ২২ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার উত্তর কুইন্সল্যান্ডের বিভিন্ন খামার থেকে ৮ লাখের বেশি মৌমাছি চুরি হয়েছে। চুরি যাওয়া মৌমাছিগুলোর মূল্য লাখ লাখ ডলার। তবে মৌমাছি হারিয়ে ক্ষতি শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মৌচাষিরা হাজার হাজার ডলার মূল্যের পরাগায়ন চুক্তির আয়ও হারাবেন।
অ্যাথারটন টেবল্যান্ডসের মৌচাষি টম বিডনার জানিয়েছেন, তিনজন আলাদা মৌচাষির কাছ থেকে মোট ৪৪টি মৌচাক চুরি হয়েছে। প্রতিটি মৌচাকে অন্তত ২০ হাজার মৌমাছি ছিল। সে হিসাবে চুরি যাওয়া মৌমাছির সংখ্যা ৮ লাখেরও বেশি।
বিডনার বলেন, ‘এটা এখনো শেষ হয়নি। আমাদের আরও অনেক মৌচাক পরীক্ষা করতে হবে। আমরা এখনো বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে সেগুলো পরীক্ষা করছি।’
চোরেরা পুরো মৌচাক নিয়ে যায়নি। এতে সহজেই ধরা পড়ার আশঙ্কা ছিল। চোর মহোদয়রা মৌচাকের ভেতরের যেটিকে ‘ব্রুড বক্স’ বলা হয়, সেটিই বের করে নিয়ে গেছে। মৌমাছি চাষের ভাষায় ‘ব্রুড বক্স’ (Brood Box) হলো কাঠের তৈরি মূল বাক্সটি, যেখানে রানি মৌমাছি ডিম পাড়ে এবং মৌমাছির ছানা বা লার্ভা বড় হয়।
মৌমাছি চাষের আধুনিক বাক্সে সাধারণত একাধিক স্তর থাকে। নিচের দিকে বা মাঝের অংশে থাকে এই ‘ব্রুড বক্স’ বা প্রজনন বাক্স। এখানেই মৌমাছির পরিবার বা কলোনির মূল প্রাণকেন্দ্র থাকে—রানি মৌমাছি, ডিম, ছানা এবং তাদের লালন-পালনের জন্য প্রয়োজনীয় মধু ও পরাগ রেণু সংরক্ষিত থাকে।
চোরেরা খামার থেকে পুরো বাক্স বা পুরো মৌচাক চুরি না করে এই ‘ব্রুড বক্স’-এর ভেতরে থাকা ফ্রেমগুলো (যাতে লাখ লাখ মৌমাছি ও ডিম থাকে) অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের নিজেদের বাক্সে তুলে নিয়ে গেছে। এরপর মালিকের আসল বাক্সটিতে ফাঁকা ফ্রেম বা অন্য কিছু বসিয়ে তা আবার আগের মতো গুছিয়ে রেখে দিয়েছে। ফলে বাইরে থেকে দেখে খামারি বা কৃষকদের বোঝার উপায় থাকে না যে বাক্সের ভেতরে কেউ হাত দিয়েছে বা মহামূল্যবান মৌমাছিগুলো চুরি হয়ে গেছে। ফলে দূর থেকে দেখলে মৌচাকটি আগের মতোই মনে হয়।
বিডনারের ভাষ্য, চোরেরা ট্রাকভর্তি সরঞ্জাম নিয়ে এসে মৌচাকের ফ্রেমগুলো নিজেদের বাক্সে স্থানান্তর করেছে। এরপর আবার মৌচাকগুলো আগের মতো সাজিয়ে রেখে গেছে। ফলে খামারিরা সহজে বুঝতে পারেননি যে সেখানে কেউ ঢুকে কিছু নিয়ে গেছে।
অদ্ভুত বিষয় হলো, চোরেরা মধুও নেয়নি। মৌচাকেই রেখে গেছে। বিডনারের ধারণা, চোরেরা সম্ভবত মৌচাষ শিল্পের ভেতরেরই কেউ।
এই চুরিতে মৌচাষিদের ক্ষতি শুধু মৌমাছি হারানোর কারণে নয়। পরাগায়ন চুক্তির হাজার হাজার ডলারের আয়ও হারাতে হবে। পাশাপাশি ফুলের পরাগায়ন কমে যাওয়ায় উৎপাদনের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিডনারের মতে, তাঁর স্মৃতিতে এটি সবচেয়ে বড় মৌমাছি চুরির ঘটনা। তবে এ ধরনের চুরি এই প্রথম নয়।
এখন উত্তর কুইন্সল্যান্ডে অ্যাভোকাডোর মৌসুম চলছে। তাই স্থানীয় চাষিদের সাথে চুক্তির ভিত্তিতে পরাগায়নের কাজে বিভিন্ন খামারে মৌচাক বসানো হয়েছে। কিছু মৌচাক আবার মহাসড়কের পাশেও রেখে দেয়া হয়।
বিডনার বলেন, আগে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে হয়নি। মৌমাছিরাই যেন পাহারার কাজ করত। কেউ মৌচাকে হাত দিতে এলে সাধারণত ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই পালিয়ে যেত।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। মেরিবা রুরাল অ্যান্ড স্টক ক্রাইম স্কোয়াডের গোয়েন্দা সার্জেন্ট বেন ক্রস এবিসিকে বলেছেন, তাঁরও ধারণা, এই চুরির পেছনে কোনো শখের মৌচাষি নয়, বরং একজন বাণিজ্যিক কৃষক থাকতে পারেন।
এর মধ্যে উত্তর কুইন্সল্যান্ডে মৌমাছির আরেক বিপদ দেখা দিয়েছে। কেয়ার্নসের দক্ষিণে এক সপ্তাহ আগে প্রথমবারের মতো ভারোয়া মাইটের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেগান ও’মারা জানান, ২০২২ সালে নিউক্যাসেলে পরজীবীটি শনাক্ত হওয়ার পর এর বিস্তার ঠেকাতে ১০ কোটি ডলারের বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাওয়া চিকিৎসাগুলোর কার্যকারিতা সীমিত। পরজীবীটির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারে আগামী ৩০ বছরে শিল্পটির ক্ষতি ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরজীবী নির্মূলের চেষ্টা থেকে সরে আসে।
ও’মারা আরও কার্যকর চিকিৎসা তৈরির একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সাথে যুক্ত আছেন। সম্ভাবনাময় একটি চিকিৎসায় কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিকশিত এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এটি খুব শিগগির পাওয়া যাবে—এমনটা বলা যাচ্ছে না। আরও কয়েক বছর লাগবে। তবে অগ্রগতি হচ্ছে।
বিডনারের কাছে মৌমাছি চুরি আর ভারোয়া মাইট—দুই বিপদই যেন একসাথে আঘাত করেছে। তিনি একে বলেছেন ‘ডাবল হ্যামি’।
উত্তর কুইন্সল্যান্ডের গরম আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরো কঠিন। এখানে মৌমাছি সারা বছরই বাচ্চা দেয়। আর পরজীবীটি মৌমাছির সেই বাচ্চাদের মধ্যেই বংশবিস্তার করে। তাই মৌচাষিদের সব সময় সতর্ক থাকতে হবে।
বিডনার বলেন, ‘আমাদের মৌচাকে এখনো মাইট শনাক্ত হয়নি। কিন্তু এ মুহূর্তে আমাদের সময় ও শক্তি সেদিকেই দেয়া উচিত। অথচ তার বদলে আমরা এই একের পর এক চুরির ঘটনার মুখে পড়েছি।’
শেষ পর্যন্ত এই গল্পের সবচেয়ে অদ্ভুত জায়গাটা হয়তো সেখানেই—৮ লাখের বেশি মৌমাছি চুরি গেছে, অথচ চোরেরা মধু পর্যন্ত নেয়নি। চুরি করেছে শুধু মৌমাছি। তাও এমন কৌশলে, যাতে দূর থেকে তাকালে বোঝার উপায় নেই, মৌচাকের ভেতর থেকে কেউ লাখ লাখ মৌমাছি নিয়ে গেছে।
নয়া দিগন্ত 
























