০২:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমঝোতার দরজা খোলা ইসলামি দলগুলোর

 

অনলাইন ডেস্ক:

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের জোট অথবা রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনÑ এই দুইয়ের কোনোটাতেই থাকছে না সক্রিয় ইসলামি দলগুলো। আগামী নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়ার বিষয়ে এখনই মুখ খুলতে চাচ্ছেন না দলগুলোর উচ্চপর্যায়ের নেতারা।

বর্তমান ব্যবস্থায় বিএনপিসহ আন্দোলনে থাকা দলগুলো নির্বাচনে না গেলেও অনেকগুলো ইসলামি দল যেকোনো পরিস্থিতিতে নর্বাচনে থাকার পক্ষে। আবার বিরোধী পক্ষ শক্তিশালী অবস্থানে গেলে বিএনপির দিকেও ঝুঁকে পড়ার রাস্তা খোলা রেখে চলছে বড় ইসলামি দলগুলো। অর্থাৎ সুযোগ বুঝে সুবিধাজনক পক্ষে তাল মেলাতে সমঝোতার সব দরজা খোলা রেখে চলছে। বর্তমানে কৌশলী পথ চলাকেই নিজেদের জন্য নিরাপদ ভাবছেন দলগুলোর অনেক নেতা।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোন পথে হাঁটছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসলামি দলগুলো। অন্যদিকে বিএনপি কী করে তা দেখার ইচ্ছায় যুগপৎ আন্দোলনে নেমেও পিছুটান দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। আর আওয়ামী লীগ সরকারের বশ মেনেছে কওমি মাদরাসাভিত্তিক আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। গত আগস্ট থেকে দুই খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত আন্দোলন, এনডিপিসহ কয়েকটি নিবন্ধিত দলের সঙ্গে মতবিনিময় করে ইসলামী আন্দোলন। নির্বাচনী জোট গড়াই ছিল উদ্দেশ্য। গত অক্টোবরে বিভাগীয় গণসমাবেশের মাধ্যমে বিএনপি রাজপথের কর্মসূচিতে ফেরায় এই উদ্যোগে এখন ভাটার টান।

রাজনৈতিক সূত্র বলছে, বিএনপি আগামী জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলে বিকল্প হবে জাপা এবং ইসলামি দলের জোট। তবে বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের দাবিতে গতিশীল হওয়ায় এবং বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল কথা বলা শুরু করায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। ধর্মভিত্তিকসহ অন্য ছোট দলগুলো এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কী করে তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। তারা খোলা রাখতে চাইছে সুবিধা নেওয়ার সব দরজা।

ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমাদের দাবি, মতবিনিময় গত বছর অনেক গতি পেলেও থমকে আছে দলীয় কর্মসূচির কারণে। তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলনের সম্মেলন ও নতুন কমিটি হয়েছে। জেলা ও মহানগর কমিটি গঠন চলছে। এ কারণে মতবিনিময়ে ভাটা পড়েছে। তবে তা আবার শুরু হবে।

ভোটের পরিসংখ্যানে জামায়াতের পর বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। তবে গত বছর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রায় ২৪ হাজার এবং রংপুরে প্রায় ৫০ হাজার ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় হয়ে চমক দেখায় হাতপাখা।

গত ১৪ বছরে জামায়াত ও কওমি ধারার ইসলামী দলগুলো বন্ধুর পথ মাড়ালেও ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতি ছিল অনেকটা সাবলীল। রাজনৈতিক সূত্রের খবর, জামায়াতের প্রভাব ক্ষুণ্ন করতে দলটির উত্থানে সরকারের ‘সহযোগিতা’ রয়েছে। যদিও নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে এবং অন্য ইস্যুতে ইসলামী আন্দোলনকে সরকারের সমালোচনামুখর থাকতে দেখা যাচ্ছে।

দেশের ধর্মভিত্তিক দলগুলো মূলত চার ধারায় বিভক্ত। প্রথম ধারা মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর অনুসারী জামায়াত। ধর্মভিত্তিক দলের দ্বিতীয় ধারা দেওবন্দের উসূলের অনুসারী। নিবন্ধিত ১০ ধর্মভিত্তিক দলের ছয়টিÑ ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং খেলাফত মজলিস এ ধারার অনুসারী। এ ছাড়া আরো বহু অনিবন্ধিত দল রয়েছে, যারা দেওবন্দের অনুসারী মাদরাসাকেন্দ্রিক।

শেষ দুটি ধারা হলো সুফিবাদী এবং দরবারভিত্তিক। দরবারভিত্তিক দুই নিবন্ধিত দল তরীকত ফেডারেশন এবং জাকের পার্টি। একমাত্র তরীকতেরই সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। দলটি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক। ফরিদপুরের বিশ্ব জাকের মঞ্জিলভিত্তিক জাকের পার্টি জোটে না থাকলেও সরকারের সমর্থক। সুফিধারার দুই নিবন্ধিত দল ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টও সরকার সমর্থক।

ইসলামী আন্দোলন বাদে বাকি নিবন্ধিত পাঁচ দলের নেতারা ছিলেন হেফাজতের নেতৃত্বে। ভাস্কর্য এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অতিথি করার বিরোধিতা করে ২০২১ সালের মার্চে রাস্তায় নামে হেফাজত। হরতালে সহিংসতায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়। সহিংসতার মামলায় হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতাসহ ছয় শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। জমিয়ত ও দুই খেলাফতের অন্তত ৫০ নেতা গ্রেপ্তার হন সহিংসতার মামলায়। বাংলাদেশ খেলাফতের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকসহ কয়েকজন এখনো কারাগারে। মামুনুল হক হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন।

নেতারা কারাগারে থাকা অবস্থায় হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি ‘চাপে’ পড়ে বিলুপ্ত করা হয়। পরের কমিটি থেকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের প্রায় সবাইকে বাদ দেওয়া হয়। পরের ২১ মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠকের পর গত ১৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নেতাকর্মীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহারসহ সাত দফা দাবি জানান হেফাজত নেতারা।

সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতে হেফাজত রাজনীতি থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয় বলে গুঞ্জন রয়েছে। কওমি মাদরাসাভিত্তিক এ সংগঠনটি সরাসরি নির্বাচন না করলেও, ভোটে প্রভাব রাখার ক্ষমতা রাখে বলে মনে করা হয়। রাজনৈতিক সূত্র বলছে, মামলায় জেরবার হেফাজত এখন সরকারের বশে এসেছে। আগামী নির্বাচনে সংগঠনটি আওয়ামী লীগের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হবে নাÑএমন কথাও চাউর আছে।

হেফাজতের কর্মসূচিতে সহিংসতার মামলায় জমিয়ত এবং খেলাফতের উভয় অংশ চাপে রয়েছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কয়েক ঘণ্টা পর জমিয়ত নেতারা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন। আড়াই মাস পর জোট ছাড়ে খেলাফত মজলিসও। এরপর দল দুটির নেতারাও একে একে জামিনে মুক্তি পান।

ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আলোচনা এবং আগামী নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক দলের জোটের বিষয়ে জমিয়তের সহসভাপতি আবদুর রব ইউসুফী বলেন, নির্বাচনী জোটের সঙ্গে আদর্শের সম্পর্ক নেই। যে কারোর সঙ্গেই হতে পারে। রাজনীতির একটি উদ্দেশ্য সংসদে যাওয়া। বিএনপি জোটে ফিরে যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ হয়নি মন্তব্য করে আবদুর রব ইউসুফী বলেন, যার সঙ্গে গেলে জমিয়তের সুবিধা হবে, তার সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করতে বাধা নেই।

খেলাফতের মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের একাদশ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোটে লড়েন। তিনিও হেফাজতের মামলায় হাজতবাস করেছেন। তিনি বলেন, খেলাফত রাজনৈতিক নয়, ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী জোটে আগ্রহী। খেলাফতের প্রস্তাব হচ্ছে, প্রত্যেক আসনেই যেন ইসলামী দলের একক প্রার্থী থাকে। তিনি জানান, নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

ইসলামী ঐক্যজোটও একসময় বিএনপির জোটে ছিল। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দু-দলের সঙ্গেই ছিল বাংলাদেশ খেলাফত। দলগুলো এখন সরকারের প্রতি নমনীয়। তবে সূত্র বলছে, দাবি আদায় করতে না পারলে তারা বিএনপির দিকে ঝুঁকবে না। বিএনপিকে কোণঠাসা করে রাখতে পারলে আওয়ামী লীগ যেভাবেই চাইবে, সেভাবেই ভোটে অংশ নেবে।

যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি পালনে বিএনপি ও অন্য দলগুলোর মতো পুলিশের অনুমতি পাচ্ছে না জামায়াত। বিনা অনুমতিতে গত ২৪ ও ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির সঙ্গে একই দিন গণমিছিল করে। এসব কর্মসূচিতে জামায়াতের দুই শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। বিএনপির ১০ দফা সমর্থন করার দুদিন পর গ্রেপ্তার হন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। বিএনপি তার গ্রেপ্তারের নিন্দা করেনি। ২৪ ও ৩০ ডিসেম্বরের কর্মসূচিতে গ্রেপ্তার জামায়াতের কর্মীদের মুক্তি চেয়ে বিবৃতি দেয়নি। তাই দলটি আপাতত বিএনপির যুগপৎ কর্মসূচিতে রাজপথে নামছে না।

Tag :
এখন আলোচনায়

সমঝোতার দরজা খোলা ইসলামি দলগুলোর

আপডেট সময় : ০৩:১৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

 

অনলাইন ডেস্ক:

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের জোট অথবা রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনÑ এই দুইয়ের কোনোটাতেই থাকছে না সক্রিয় ইসলামি দলগুলো। আগামী নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়ার বিষয়ে এখনই মুখ খুলতে চাচ্ছেন না দলগুলোর উচ্চপর্যায়ের নেতারা।

বর্তমান ব্যবস্থায় বিএনপিসহ আন্দোলনে থাকা দলগুলো নির্বাচনে না গেলেও অনেকগুলো ইসলামি দল যেকোনো পরিস্থিতিতে নর্বাচনে থাকার পক্ষে। আবার বিরোধী পক্ষ শক্তিশালী অবস্থানে গেলে বিএনপির দিকেও ঝুঁকে পড়ার রাস্তা খোলা রেখে চলছে বড় ইসলামি দলগুলো। অর্থাৎ সুযোগ বুঝে সুবিধাজনক পক্ষে তাল মেলাতে সমঝোতার সব দরজা খোলা রেখে চলছে। বর্তমানে কৌশলী পথ চলাকেই নিজেদের জন্য নিরাপদ ভাবছেন দলগুলোর অনেক নেতা।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোন পথে হাঁটছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসলামি দলগুলো। অন্যদিকে বিএনপি কী করে তা দেখার ইচ্ছায় যুগপৎ আন্দোলনে নেমেও পিছুটান দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। আর আওয়ামী লীগ সরকারের বশ মেনেছে কওমি মাদরাসাভিত্তিক আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। গত আগস্ট থেকে দুই খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত আন্দোলন, এনডিপিসহ কয়েকটি নিবন্ধিত দলের সঙ্গে মতবিনিময় করে ইসলামী আন্দোলন। নির্বাচনী জোট গড়াই ছিল উদ্দেশ্য। গত অক্টোবরে বিভাগীয় গণসমাবেশের মাধ্যমে বিএনপি রাজপথের কর্মসূচিতে ফেরায় এই উদ্যোগে এখন ভাটার টান।

রাজনৈতিক সূত্র বলছে, বিএনপি আগামী জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলে বিকল্প হবে জাপা এবং ইসলামি দলের জোট। তবে বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের দাবিতে গতিশীল হওয়ায় এবং বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল কথা বলা শুরু করায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। ধর্মভিত্তিকসহ অন্য ছোট দলগুলো এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কী করে তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। তারা খোলা রাখতে চাইছে সুবিধা নেওয়ার সব দরজা।

ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমাদের দাবি, মতবিনিময় গত বছর অনেক গতি পেলেও থমকে আছে দলীয় কর্মসূচির কারণে। তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলনের সম্মেলন ও নতুন কমিটি হয়েছে। জেলা ও মহানগর কমিটি গঠন চলছে। এ কারণে মতবিনিময়ে ভাটা পড়েছে। তবে তা আবার শুরু হবে।

ভোটের পরিসংখ্যানে জামায়াতের পর বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। তবে গত বছর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রায় ২৪ হাজার এবং রংপুরে প্রায় ৫০ হাজার ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় হয়ে চমক দেখায় হাতপাখা।

গত ১৪ বছরে জামায়াত ও কওমি ধারার ইসলামী দলগুলো বন্ধুর পথ মাড়ালেও ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতি ছিল অনেকটা সাবলীল। রাজনৈতিক সূত্রের খবর, জামায়াতের প্রভাব ক্ষুণ্ন করতে দলটির উত্থানে সরকারের ‘সহযোগিতা’ রয়েছে। যদিও নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে এবং অন্য ইস্যুতে ইসলামী আন্দোলনকে সরকারের সমালোচনামুখর থাকতে দেখা যাচ্ছে।

দেশের ধর্মভিত্তিক দলগুলো মূলত চার ধারায় বিভক্ত। প্রথম ধারা মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর অনুসারী জামায়াত। ধর্মভিত্তিক দলের দ্বিতীয় ধারা দেওবন্দের উসূলের অনুসারী। নিবন্ধিত ১০ ধর্মভিত্তিক দলের ছয়টিÑ ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং খেলাফত মজলিস এ ধারার অনুসারী। এ ছাড়া আরো বহু অনিবন্ধিত দল রয়েছে, যারা দেওবন্দের অনুসারী মাদরাসাকেন্দ্রিক।

শেষ দুটি ধারা হলো সুফিবাদী এবং দরবারভিত্তিক। দরবারভিত্তিক দুই নিবন্ধিত দল তরীকত ফেডারেশন এবং জাকের পার্টি। একমাত্র তরীকতেরই সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। দলটি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক। ফরিদপুরের বিশ্ব জাকের মঞ্জিলভিত্তিক জাকের পার্টি জোটে না থাকলেও সরকারের সমর্থক। সুফিধারার দুই নিবন্ধিত দল ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টও সরকার সমর্থক।

ইসলামী আন্দোলন বাদে বাকি নিবন্ধিত পাঁচ দলের নেতারা ছিলেন হেফাজতের নেতৃত্বে। ভাস্কর্য এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অতিথি করার বিরোধিতা করে ২০২১ সালের মার্চে রাস্তায় নামে হেফাজত। হরতালে সহিংসতায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়। সহিংসতার মামলায় হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতাসহ ছয় শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। জমিয়ত ও দুই খেলাফতের অন্তত ৫০ নেতা গ্রেপ্তার হন সহিংসতার মামলায়। বাংলাদেশ খেলাফতের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকসহ কয়েকজন এখনো কারাগারে। মামুনুল হক হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন।

নেতারা কারাগারে থাকা অবস্থায় হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি ‘চাপে’ পড়ে বিলুপ্ত করা হয়। পরের কমিটি থেকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের প্রায় সবাইকে বাদ দেওয়া হয়। পরের ২১ মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠকের পর গত ১৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নেতাকর্মীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহারসহ সাত দফা দাবি জানান হেফাজত নেতারা।

সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতে হেফাজত রাজনীতি থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয় বলে গুঞ্জন রয়েছে। কওমি মাদরাসাভিত্তিক এ সংগঠনটি সরাসরি নির্বাচন না করলেও, ভোটে প্রভাব রাখার ক্ষমতা রাখে বলে মনে করা হয়। রাজনৈতিক সূত্র বলছে, মামলায় জেরবার হেফাজত এখন সরকারের বশে এসেছে। আগামী নির্বাচনে সংগঠনটি আওয়ামী লীগের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হবে নাÑএমন কথাও চাউর আছে।

হেফাজতের কর্মসূচিতে সহিংসতার মামলায় জমিয়ত এবং খেলাফতের উভয় অংশ চাপে রয়েছে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কয়েক ঘণ্টা পর জমিয়ত নেতারা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন। আড়াই মাস পর জোট ছাড়ে খেলাফত মজলিসও। এরপর দল দুটির নেতারাও একে একে জামিনে মুক্তি পান।

ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আলোচনা এবং আগামী নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক দলের জোটের বিষয়ে জমিয়তের সহসভাপতি আবদুর রব ইউসুফী বলেন, নির্বাচনী জোটের সঙ্গে আদর্শের সম্পর্ক নেই। যে কারোর সঙ্গেই হতে পারে। রাজনীতির একটি উদ্দেশ্য সংসদে যাওয়া। বিএনপি জোটে ফিরে যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ হয়নি মন্তব্য করে আবদুর রব ইউসুফী বলেন, যার সঙ্গে গেলে জমিয়তের সুবিধা হবে, তার সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করতে বাধা নেই।

খেলাফতের মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের একাদশ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোটে লড়েন। তিনিও হেফাজতের মামলায় হাজতবাস করেছেন। তিনি বলেন, খেলাফত রাজনৈতিক নয়, ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী জোটে আগ্রহী। খেলাফতের প্রস্তাব হচ্ছে, প্রত্যেক আসনেই যেন ইসলামী দলের একক প্রার্থী থাকে। তিনি জানান, নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

ইসলামী ঐক্যজোটও একসময় বিএনপির জোটে ছিল। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দু-দলের সঙ্গেই ছিল বাংলাদেশ খেলাফত। দলগুলো এখন সরকারের প্রতি নমনীয়। তবে সূত্র বলছে, দাবি আদায় করতে না পারলে তারা বিএনপির দিকে ঝুঁকবে না। বিএনপিকে কোণঠাসা করে রাখতে পারলে আওয়ামী লীগ যেভাবেই চাইবে, সেভাবেই ভোটে অংশ নেবে।

যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি পালনে বিএনপি ও অন্য দলগুলোর মতো পুলিশের অনুমতি পাচ্ছে না জামায়াত। বিনা অনুমতিতে গত ২৪ ও ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির সঙ্গে একই দিন গণমিছিল করে। এসব কর্মসূচিতে জামায়াতের দুই শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। বিএনপির ১০ দফা সমর্থন করার দুদিন পর গ্রেপ্তার হন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। বিএনপি তার গ্রেপ্তারের নিন্দা করেনি। ২৪ ও ৩০ ডিসেম্বরের কর্মসূচিতে গ্রেপ্তার জামায়াতের কর্মীদের মুক্তি চেয়ে বিবৃতি দেয়নি। তাই দলটি আপাতত বিএনপির যুগপৎ কর্মসূচিতে রাজপথে নামছে না।