
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এর মধ্যে বুধবার সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ চারটি কমিশন গতকাল বুধবার প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদন জমা দেওয়া অন্য তিন কমিশন হচ্ছে দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন, নির্বাচন সংস্কার কমিশন ও পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশন। রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক ও আলোচনা শেষে তৈরি করা হয় এসব চূড়ান্ত প্রতিবেদন।
সংবিধান সংস্কারে গঠিত কমিশন যে প্রতিবেদন দিয়েছে সেখানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি, দেশের সাংবিধানিক নাম এবং সংসদীয় কাঠামোতে পরিবর্তনের মতো সুপারিশ রয়েছে। এদিকে রাজনীতি ও আমলানির্ভরতা কমিয়ে দুদককে শক্তিশালী করতে সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন। নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে নির্বাচনি আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে এ সংক্রান্ত কমিশন। জুলাই-আগস্টে হতাহতের জন্য দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তির সুপারিশ এবং পুলিশ যেন রাজনৈতিক দলের বাহিনীতে পরিণত না হয় ও বল প্রয়োগ না করতে পারে এমন সুপারিশ করা হয়েছে।
চার সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব হাতে পাওয়ার পর এক বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, আজকে যে চারটি সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সংস্কার প্রতিবেদনের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের একটা চার্টার তৈরি করা হবে। যা হবে নতুন বাংলাদেশের একটা চার্টার। এটা তৈরি হবে মতৈক্যের ভিত্তিতে। নির্বাচন হবে, সবকিছুই হবে; কিন্তু চার্টার থেকে সরা যাবে না।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রীয়াজসহ সংশ্লিষ্ট কমিশনের সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ: জাতীয় সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদের নিম্নকক্ষে আসন থাকবে ৪০০, নির্বাচন হবে বর্তমান পদ্ধতিতে। এর মধ্যে ১০০ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। তারা নির্বাচিত হবেন সরাসরি ভোটে। আর উচ্চকক্ষে আসন থাকবে ১০৫টি। এ ছাড়া সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ বছর করার সুপারিশ করেছে কমিশন। বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ পরিবর্তন করে ‘জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ’ সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার যে চার মূলনীতি রয়েছে সেগুলো হলো জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এর মধ্যে সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাদের সুপারিশ করা হয়েছে।
বর্তমানের চার মূলনীতির মধ্যে শুধু গণতন্ত্র রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত নতুন পাঁচ মূলনীতির মধ্যে। সুপারিশ করা নতুন পাঁচটি মূলনীতি হলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র। বাংলাদেশের জনগণের নাগরিকত্ব হিসেবে ‘বাঙালি’ বাদ দিয়ে ‘বাংলাদেশি’ করার সুপারিশ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুবার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ হবে চার বছর। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা হতে পারবেন না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতে আলাদা সেক্রেটারিয়েট বা সচিবালয় তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। রয়েছে সংবিধানের আলোচিত ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব।
৪০ শতাংশ ভোট না পড়লে পুনর্নির্বাচন: নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের বিধান বাতিল করা। নির্বাচনকালীন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করা। কোনো আসনে মোট ভোটারের ৪০ শতাংশ ভোট না পড়লে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন বন্ধ করা, ‘না’ ভোটের বিধান প্রবর্তন করা।
সংসদীয় আসনের ভোটার প্রতি ১০ টাকা হিসেবে নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারণের বিধান করা। সব নির্বাচনি ব্যয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা আর্থিক প্রযুক্তির (যেমন বিকাশ, রকেট) মাধ্যমে পরিচালনা করা। নির্বাচনি আসনভিত্তিক নির্বাচনি ব্যয় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবিড়ভাবে নজরদারি করা। প্রার্থী এবং দলের নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাবের রিটার্নের নিরীক্ষা এবং হিসাবে অসংগতির জন্য শান্তির বিধান করা। পক্ষপাতদুষ্ট ভুয়া পর্যবেক্ষক নিয়োগ বন্ধ করা। ব্যক্তি পর্যায়ে পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিধান চালু করা। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রদত্ত বৈধ কার্ডধারী সাংবাদিকদের সরাসরি ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ, অনিয়মের চিত্র ধারণ, নির্বাচনের দিনে মোটরসাইকেল ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করা।
দুদককে শক্তিশালী করতে ৪৭ সুপারিশ: ব্যক্তিগত স্বার্থে সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ লেনদেনকে অবৈধ ঘোষণা এবং আইনে কালো টাকা সাদা করার বৈধতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করাসহ ৪৭ দফা সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া দুর্নীতি দমনে সব সেবামূলক খাত স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশনের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। দুদককে শক্তিশালী, কার্যকর ও ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কমিশনারদের পদ বাড়ানো, নিয়োগ, সার্চ কমিটি, আইনের সংস্কার, বেতন বৃদ্ধি ও প্রণোদনার জন্য সুপারিশ করেছে কমিশন। সংস্কার কমিশন বলছে, দুর্নীতি দমন শুধু দুদকের একার কাজ নয়, এখানে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে।
পুলিশের শক্তি প্রয়োগের সীমা নির্ধারণ চায় সংস্কার কমিশন: বেআইনি সমাবেশ ও শোভাযাত্রা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের শক্তি প্রয়োগের সীমা নির্ধারণ, পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার ও আসামিকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা চেয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া বাহিনী সংস্কারের জন্য ২২টি আইনের সংশোধন ও পরিমার্জন চেয়েছে কমিশন। প্রতিবেদনে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার এবং রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিটি থানায় নারী পুলিশের জন্য একটি ডেস্ক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ৬টি কমিশনেরই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি জানান, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নাগাদ এসব প্রতিবেদন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। সূত্র: খোলাকাগজ
অনলাইন ডেস্ক 













