
প্রকৃতিতে শীতের কাঁপন রেখে বিদায় নিল রিক্ত পৌষ। এলো মাঘ। এ মাসেই শীত ঋতুর সমাপ্তি। বাংলায় মাঘ মানেই হাড় কাঁপানো শীত। ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো শীত। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম পৌষ সংক্রান্তি পালনের মধ্য দিয়ে আজ এলো সেই মাঘ। কথিত আছে, বাঘেরা শীত-ভীতিতে পালিয়ে থাকে এই মাঘ মাসেই! কিন্তু ইদানীং মনে হবে, এ শুধু কথার কথা, কোথায় সেই কুয়াশাঘন না-দেখা সূর্যাকাশ, কোথায় সেই হিম হিম ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া! শীত বলতে এখন শুধু দুয়েক দিনের শৈত্যপ্রবাহ যেন। এ জন্য দায়ী বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।
তবে জাঁকিয়ে না এলেও এখনও শীত আসে, কুয়াশা ঝরে পড়ে ঘাসে, কুঁড়েঘরে, টিনের চালে; ভোরে- কখনও কখনও সারাদিন! একটা সময় ছিল, যখন এই বাংলায় শীত আসা মানেই ছিল মাটির কলসভর্তি টলমলে খেজুর-রস, ঢেঁকিতে চাল পাড়, ভাঁপা, চিতই, পুলিসহ কত পিঠা! ঘন কুয়াশা আর হিম ঠাণ্ডা উপেক্ষা। গরু-বাছুর-লাঙল, রাখাল-কৃষক, জমিচাষ, উলে বোনা ফুলহাতা জামা-চাদর, লেপ মুড়ে শুয়ে থাকা, দলবেঁধে ধারেকাছে ঘোরাঘুরি, বনভোজন, আরও কত কী! সার্কাস, যাত্রা, থিয়েটার, ষাঁড়ের লড়াই, ঘোড়দৌড়, মোরগ লড়াই- মাঘ মাসেই বেশি হতো। পুঁথিপাঠ, গম্ভীরা গান, কবিগান, নদী-বিল-খাল-পুকুরের কম জলে মাছ শিকারের কথা ভুলে যাননি তো? আগে এসব এই মাঘ মাসেই বেশি হতো।
সবুজের বুকে হলুদ সরিষা ক্ষেত, মুগ্ধ ও বিমোহিত না হয়ে কেউ পারে? শীতের সকালের সূর্য ওঠার মনোরম দৃশ্য, ভোরে ঘুম থেকে উঠে নাড়া-খড়, পাটকাঠি জ্বালিযে আগুনে হাত-পা সেঁকা, কনকনে ঠাণ্ডায় মিঠে রোদ পিঠে মাখানো, আহা, কী শান্তি! খালে-বিলে দূর দেশ থেকে ছুটে আসত ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি!
শীত এখনও আসে। প্রকৃতিজুড়ে ভাসে, বিশেষ করে মাঘ মাসে। লেপ-কাঁথায় জড়ানোও হয় শরীর। হালকা শীতটা আরও উপভোগ্য করে তুলতে বাড়ির উঠোনে, সড়কের মোড়ে বা ধারে খড়িতে, নাড়ায়, শুকনো পাতায় আগুন ধরিয়ে উত্তাপ নেওয়া হয়। এমনই শীত কিংবা আরও গভীর হিমমিশ্রিত শীত এই বাংলায় মাঘ মাসে বহু প্রাচীনকাল থেকেই জেঁকে বসত। প্রমাণও মেলে ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কালকেতু উপন্যাসে- ‘পউষের প্রবল শীত সুখী যেজন।/ তুলি পাড়ি আছারি শীতের নিবারণ/ ফুল্লরার কত আছে কর্মের বিপাক।/ মাঘ মাসে কাননে তুলিতে নাহি শাক।’ সেই তখন থেকে অদ্যবধি আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা নানা ব্যঞ্জনায় শীতের বন্দনা করেছেন। অংকিত করেছেন নানাভাবে। কবি জসীমউদ্দীন তার ‘রাখাল ছেলে’ কবিতায় লিখেছেন- ‘ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশির-ঝরা ঘাসে,/ সারা রাতের স্বপন আমার মিঠেল রোদে হাসে।
উষ্ণ জলবায়ুর প্রভাবে হেমন্ত আর বসন্তের মাঝে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘এসেছে শীত গাহিতে গীত বসন্তেরই জয়’ নিয়ে। এই মাঘেই আমগাছে বোল ধরে। থরে থরে ভরে ওঠে গাছ। মৌ-মৌ গন্ধে ধন্ধে না পড়ে উপায় থাকে না কারও। আর এই মাঘের সূর্যের কাছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো আমাদেরও চাওয়া ওই একটাই- ‘সকালের এক-টুকরো রোদ্দুর/ এক টুকরো সোনার চেয়েও মনে হয় দামী।/ ঘর ছেড়ে আমরা এদিক ওদিকে যাই/ এক-টুকরো রোদ্দুরের তৃষ্ণায়।’
বিশেষ সংবাদদাতা 













