
কিছুটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। তারা রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার জন্য গোপন তৎপরতা চালাচ্ছে-এমন তথ্যে তৎপর হয়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবগুলো বিভাগ। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা। গুলশানে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের একটি বড় ধরনের ঝটিকা মিছিল সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। গোয়েন্দারাও ওই মিছিলের বিষয়ে আগাম কোনো তথ্য জানতে পারেননি।
এ কারণে মিছিলটি ঘিরে আওয়ামী লীগের গোপন বা প্রকাশ্যে যে কোনো কার্যক্রম নিয়ে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। নিষিদ্ধ দলটির মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থতার দায়ে এরই মধ্যে গুলশান জোনের ডিসি ও থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঠিক একই সময়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসান সম্প্রতি এক কথোপকথনে স্পষ্ট দাবি করেন, ‘আওয়ামী লীগ আবার ফিরবে, আওয়ামী লীগ এলে কিছুই হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে। ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে, এই মাসেই শেখ হাসিনার আসা উচিত ছিল। শেখ হাসিনা ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না।’
অনেকের মতে, পেছন থেকে আওয়ামী লীগের বড় ধরনের সহায়তা ছিল বলেই পদে বসে ওই ওসি এমন দেশবিরোধী আলোচনা করতে পারেন। তাই রাকিবকে নিয়েও চলছে সরকারের নানামুখী তদন্ত। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সক্রিয় করার নেপথ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ বা মাঝারি পর্যায়ের একটা অংশের মদদ থাকতে পারে বলে এতদিন যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল; একাধিক ঘটনায় তা কিছুটা প্রকাশ হওয়ায় এর নেপথ্য কারণ বের করার চেষ্টা করছে সরকার। এজন্য নজর রাখা হচ্ছে বিতর্কিত পুলিশের কর্মকাণ্ডের ওপর।
২০০৯ থেকে ২০২৪-আওয়ামী আমলের সাড়ে ১৫ বছরের দলীয়করণের জের ধরে প্রশাসনের ভেতরে এখনো কিছু অদৃশ্য নেটওয়ার্ক রয়ে গেছে, যা আওয়ামী লীগকে গোপনে ইন্ধন জোগাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে যে কোনো গোপন আঁতাত ও অপতৎপরতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। অশুভ রাজনৈতিক তৎপরতা এবং যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি রুখে দিতে ছক আঁকছে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে থাকা এবং দেশ-বিদেশে পলাতক নেতাকর্মীরা মাঠে নামার গোপন ছকের অংশ হিসাবে মাঝে মধ্যেই ঝটিকা মিছিল ও গোপন আস্তানায় মিটিং করছে। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানে না, ঠিক এমনটি নয়। বরং কোনো কোনো ঘটনায় তাদের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে মিছিল বের করারও তথ্য সামনে আসছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১১ সেপ্টেম্বর দিনের বেলায় কূটনৈতিক জোন গুলশানে ঝটিকা মিছিলটি করার আগে মিছিলকারীরা গুলশান থানা পুলিশের বেশ কয়েকজনের সহায়তা পেয়েছিলেন। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গোপন চ্যাট বক্সের স্ক্রিন শট থেকে জানা যায়, মিছিলের আগের রাতেই পরের দিনের কর্মসূচি ঠিক করা হয়। গুলশান থানা পুলিশের আশ্বাসও পায় তারা। সে মোতাবেক মিছিল যখন বের করা হয় তখন সড়কে কোনো পুলিশ সদস্য বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ছিলেন না। ফলে নির্বিঘ্নে মিছিলটি বের করার সুযোগ পায় তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল গুলশানের মিছিলের ক্ষেত্রেই ঘটছে তা নয়, রাজধানীসহ সারা দেশেই এভাবে ভেতরে ভেতরে ফ্যাসিস্টদের দোসর পুলিশ নানাভাবে নিষিদ্ধ দলটিকে সহায়তার চেষ্টা করছে।
জানা গেছে, আওয়ামীপন্থি পুলিশের কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে আশ্রয় নিয়ে নানাভাবে পুলিশ বাহিনীকে সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান ও চাকরিচ্যুত অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম পুলিশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য জুলাই আন্দোলনে পুলিশ হত্যা কার্ড নিয়ে খেলছেন। আন্দোলনে দেড় হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও কয়েক হাজার আন্দোলনকারীকে পঙ্গু করে দেওয়া বিষয়টি চেপে গিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সম্প্রতি বিদেশে বসে দাবি করে তিনি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। তার দাবি, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন থাকা রাজনৈতিক দলকে কেবল নিষেধাজ্ঞা বা পুলিশি শক্তি দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ২০২৪ সালের সহিংসতায় কোনো হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া এবং কিছু থানা ও স্থাপনা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের নিচের পর্যায়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক কাজ করছে বলে তথাকথিত একটি টক শোতে যুক্ত হয়ে মনিরুল ইসলাম দাবি করেন। তিনি বলেন, পুলিশ যখন কেবল ঝটিকা মিছিল ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী আটক করতে তাদের ৯০ শতাংশ মনোযোগ দিচ্ছে, তখন দেশের ক্রাইম কন্ট্রোল ও জঙ্গিবাদবিরোধী কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তার এ ধরনের বক্তব্যে পুলিশে থাকা আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের উসকে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এতে কিছুটা উৎসাহ পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তারা বলছেন, মনিরুলদের এ ধরনের উসকানিমূলক কথাবার্তায় পুলিশ বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বাহিনীর কাজের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এদিকে শুক্রবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, পতিত সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে এলে তাকে হাতকড়া দিয়ে রিসিভ করা হবে। বাংলাদেশের মানুষের ওপর যে মানবতাবিরোধী আচরণ করেছে, তার বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ঝটিকা মিছিল ও সমাবেশ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়তা বাড়িয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে নানাভাবে চেষ্টা করছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে দেশের সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলো এবং রাজধানী ঢাকার কয়েকটি স্পটে হঠাৎ ব্যানার নিয়ে কয়েক মিনিটের মহড়া দিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পুলিশের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে তারা। সাম্প্রতিক সময়ে গুলশান, উত্তরা, পিরোজপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, বরিশাল, বাগেরহাট ও নেত্রকোনার ঝটিকা মিছিল ভাবিয়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। ঝটিকা মিছিল নিয়ে মাঠ পুলিশে কিছুটা আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। কারণ পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কোনো এলাকায় ঝটিকা মিছিল হলে তার দায় এসপি, ডিসি ও ওসিকে নিতে হবে। ইতোমধ্যেই এ বক্তব্যের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
যুগান্তর 





















