
অস্থায়ী আদালতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে শুনানি হয়নি ২০০৯ সালে পিলখানায় নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা মামলার। পুরান ঢাকার বকশীবাজার এলাকায় সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে অস্থায়ী বিশেষ আদালতে বহুল আলোচিত এ মামলার বিচারকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল গতকাল বৃহস্পতিবার। কিন্তু মাদ্রাসার মাঠে অস্থায়ী আদালত বসানোর প্রতিবাদে গত বুধবার রাত থেকেই সেখানে অবস্থান নেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। এমনকি গভীর রাতে বিশেষ এই আদালতের এজলাসে ভাঙচুরের পর অগ্নিসংযোগ করে সবকিছু জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ফলে এ আদালতে গতকাল শুনানি করতে পারেননি বিচারক।
এদিকে বিভিন্ন দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের মতো শাহবাগ অবরোধ করেন চাকরিচ্যুত বিডিআর
সদস্য ও তাদের স্বজনরা। ফলে ব্যস্ত এ সড়কসহ আশপাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয়ে তীব্র যানজটের, ভোগান্তি পোহাতে হয় পথে বের হওয়া নগরবাসীকে।
অস্থায়ী আদালতের এজলাসকক্ষ পুড়ে যাওয়ায় তা সংস্কারের আগে সহসা এখানে বিচারকাজ পরিচালনা করা সম্ভব না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি (পিপি) মো. বোরহান উদ্দিন। গতকাল তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এই অস্থায়ী আদালতে পিলখানা হত্যাকা-ের ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক দ্রব্য মামলার শুনানির দিন ধার্য ছিল। তবে পুড়ে যাওয়ায় শুনানি হয়নি। কারণ এখানে আজ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার মতো পরিবেশ নেই। সঙ্গত কারণে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের দুই আইনজীবীকে ডেকে বিচারক আজকের মতো আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করেছেন।
গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পুড়ে যাওয়া এজলাস কক্ষ পরিদর্শন করেন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক ইব্রাহিম মিয়া। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউশন টিম, আইনজীবী ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। বিচারক রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে বেলা ১২টা ১০ মিনিটে চলে যান। এর আগে, বিডিআর বিদ্রোহ মামলার এই বিচারক বলেন, এখানে বর্তমানে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। পরে এই বিস্ফোরক মামলার জামিন শুনানি আগামী ১৯ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকালে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত জানান বিচারক।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মকর্তা রোজিনা আক্তার জানান, বুধবার রাত ৩টা ১০ মিনিটে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতের এজলাসে ভাঙচুরের পর অগ্নিসংযোগের খবর পান তারা। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে তাদের বাধা দেওয়া হয়। বাধার মুখে তারা আগুন নেভাতে পারেননি। গতকাল সকাল সোয়া ১০টার দিকে ফায়ার ফাইটাররা ফের ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, এজলাস পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
এদিকে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতের এজলাস কক্ষে কে বা কারা আগুন দিয়েছে, এ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অগ্নিসংযোগকারীদের শনাক্ত করতে পারেননি তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের কেউ কেউ বলছেন, ৫ আগস্টের পর সেই কক্ষে আগুন দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, একদল ব্যক্তি গত বুধবার রাতে এখানে ভাঙচুরের পর অগ্নিকা- ঘটিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নিরাপত্তাবেষ্টনীর চাদরে ঘেরা এই এজলাস কক্ষে দুর্বৃত্তরা কীভাবে অগ্নিসংযোগ করে পালাল?
চকবাজার থানার ওসি মো. রেজাউল হোসেন বলেন, বিশেষ আদালতের ফটকে তালা লাগানো ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে বিশেষ আদালতের কক্ষ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখেন। ফায়ার সার্ভিসের উপস্থিতিতে কিছুক্ষণ পর সেই ধোঁয়া আর দেখা যায়নি। এজলাসে কারা আগুন দিয়েছে, তদন্তের পর জানা যাবে। এতে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
এদিকে আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতের বিচারকাজ বন্ধের দাবি এবং এই মাঠ থেকে বিশেষ এই আদালত সরানোর দাবিতে গতকাল সকালে বকশীবাজারে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনের সড়ক, বকশীবাজার মোড় এবং আশপাশের গলির প্রবেশমুখ বাঁশ দিয়ে আটকে রাখেন তারা। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এখানে বিচারকাজ চলমান থাকলে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘœ ঘটবে। এ বিষয়ে আগে বেশ কয়েকবার মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করা হলেও কেউ কর্ণপাত করেননি। তাই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সড়ক ছাড়বেন না বলেও হুশিয়ারি দেন তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সকাল থেকেই ঘটনাস্থলে ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেন। আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের অস্থায়ী আদালতে বিডিআর বিদ্রোহ মামলার ‘বিচারকাজ হচ্ছে না’ বলে শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করা হলে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা সড়ক থেকে সরে যান।
এদিকে শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে আদালতের সামনের রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে আশপাশের রাস্তায়ও তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
পুলিশের চকবাজার অঞ্চলের সহকারী কমিশনার মো. মাহফুজার রহমান বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিতে আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে পিলখানা হত্যাকা-ে হওয়া মামলায় দ-িত সাবেক বিডিআর সদস্যদের কারামুক্তি, মামলার পুনঃতদন্ত, ন্যায়বিচার নিশ্চিত, চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের পুনর্বহাল-পুনর্বাসনের দাবিতে গত বুধবার অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়। চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যসহ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য-স্বজনরা এই কর্মসূচি পালন করেন। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল রাজধানীর শাহবাগে সড়ক আটকে ‘ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন তারা। গতকাল বেলা দেড়টার দিকে শাহবাগ ‘ব্লকেড’ করেন তারা। এতে আশপাশের ব্যস্ত সড়কগুলোতে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। তৈরি হয় তীব্র যানজট।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যরা ও তাদের স্বজনরা। এরপর পিলখানা হত্যাকা-ে দ-িত বিডিআর সদস্যদের মুক্তি, মিথ্যা মামলা বাতিল, চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল ও পুনর্বাসন এবং পিলখানা হত্যা মামলায় পুনঃতদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। দুপুর ১টার দিকে চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যসহ ভুক্তভোগী’ পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মিছিল নিয়ে এসে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়। দুই ঘণ্টা অবরোধ শেষে আন্দোলনকারীরা আলটিমেটাম দিয়ে শাহবাগ ছেড়ে শহীদ মিনারে ফিরে যান।
চাকরিচ্যুত বিডিআর সদস্যদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে- রিমান্ডে বিডিআর সদস্যদের মৃত্যুর সঠিক কারণ উদ্ঘাটনের মাধ্যমে বিচারসহ মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ, কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ প্রদান, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রে ক্ষতিগ্রস্ত বিডিআর সদস্যদের দাবি অন্তর্ভুক্ত করা এবং ২৫ ফেব্রুয়ারিকে সেনা হত্যা দিবস ঘোষণা করা।