সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০২:৪৫ অপরাহ্ন

চুয়াডাঙ্গায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং ডে উদযাপন

বিশেষ প্রতিনিধি, চুয়াডাঙ্গা: “কমিউনিটি পুলিশের মূলমন্ত্র, শান্তি-শৃঙ্খলা সর্বত্র” প্রতিপাদ্য বিষয়টিকে ধারণ করে চুয়াডাঙ্গায় জেলা পুলিশ এবং কমিউনিটি পুলিশিং সমন্বয় কমিটির আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং ডে উদযাপন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে শনিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গা সদর থানা চত্বরে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচী উদ্বোধনের মাধ্যমে দিনব্যাপী কার্যক্রমের শুরু করা হয়। পরে ১০টার দিকে মাথাভাঙ্গা নতুন ব্রীজ থেকে বেলুন, ফেস্টুন ও কবুতর উড়িয়ে মূল আয়োজনের উদ্বোধন করা হয়। পরে, শহীদ হাসান চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরের ডিসি সাহিত্য মঞ্চে গিয়ে শেষ হয়। পরে আলোচনা সভা, রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন এমপি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, এক সময় স্থানীয় পত্রিকায় প্রতিদিন লেখা হতো আজকে কয়টা উইকেট পড়েছে। মাথাভাঙ্গা নদীতে পুরোনো ওই মাথাভাঙ্গা ব্রিজে এক সময় লাশ ভেসে থাকতো। এ রকম দিন চুয়াডাঙ্গাতে গেছে। আমাদের এক সিনিয়র নেতা তোফায়েল ভাই আমাকে একদিন বলেছে, এই ছেলুন তোর ঘুম হয়? প্রথমে বুঝতে পারিনি। আমি বললাম, কেন ঘুম হবে না কেন? তো উনি বললেন, প্রতিদিন হত্যা হয়, ওর মধ্যে তোর ঘুম হয়? সন্ধ্যা হলেও আগে মানুষ চুয়াডাঙ্গায় থাকতে চাইতেন না। সেই যে ভয়ানক দিন গেছে চুয়াডাঙ্গাবাসীর সামনে। সত্যিই ভয়ানক দিন। সেই সময় ভয়ানক দিনগুলোই পুলিশকে সামনে রেখে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সেই সময়কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আমাকে সামনে নিয়ে, নেত্রী আমাকে বললো ছেলুন এইগুলোকে উৎখাত করতে হবে। তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাঁচ/ছয় বার চুয়াডাঙ্গা এসছেন। আমাদের জেলায় সন্ত্রাসকে নিমূল করতে সাহায্য করেছে পুলিশ। মুখ্য ভূমিকা পুলিশ পালন করার জন্য আজকে চুয়াডাঙ্গা সন্ত্রাসমুক্ত হয়েছে।

প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাজী আলী আজগর টগর এমপি। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, মহানযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা ছিলো। প্রথম আক্রমন হয়েছিলো রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। পুলিশ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্য নিরলস পরিশ্রম করছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর পুলিশকে আধুনিক করে তুলছেন। ডিজিটাল প্রযুক্তি আসছে, এটাও বঙ্গবন্দু কন্যার দেয়া। আজকের পুলিশ ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেক শক্তিশালী হয়েছে। এক সময় নেতারা পুলিশকে বিভিন্ন চাপ দিয়েছে। কই আমি তো এমপি, কখনো কাউকে বলিনি তো এই মামলাটা নেয়া যবে না, ওইটা নিতে হবে। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, আমরা বলিনা। কারণ, আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শেও সৈনিক। আমরা শেখ হাসিনার কর্মী। নেত্রী যেটা বলে, আমরা সেটাই করি। পুলিশ বাহিনীকে বিতর্কিত করার জন্য জামাত-বিএনপি অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। এখন আমাদেও চুয়াডাঙ্গা জেলাই একটা দেখান তো, কোথায় মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। মনগড়া অনেকেই অনেক কথা বলতে পারে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি লাল সবুজ পতাকা। পেয়েছি একটি বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর যে স্বপ্ন ছিলো খুদামুক্ত, দারিদ্র মুক্ত এবং ধর্ম নিরপেক্ষ একটি সোনার বাংলাদেশ গড়ার। সে সময় বঙ্গবন্ধু তার সেই নীতি আদর্শ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছিলেন। আর অল্প সময়ের মধ্যেই একটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলো। ঠিক তখনই তাকে স্বপরীবারে হত্যা করা হয়েছে।
আলোচনা সভায় বিভাগীয় সমন্বয়ক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, খুলনা বিভাগের অ্যাডিশনাল জিআইজি নিজামুল হক মোল্যা। তিনি বলেন, ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে কমিউনিটি পুলিশ এগিয়ে যাচ্ছে। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ নানাভাবে চেষ্টা করে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশকে সহায়তা করছে কমিউনিটি পুলিশ। আমাদের যারা সম্মানিত জনগণ রয়েছেন আপনারা সকলেই কিন্তু কমিউনিটি পুলিশের অংশ। আর এজন্য বলতে চাই, সমাজ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম খান বলেন, কাউকে পিছিয়ে রেখে উন্নয়ন সম্ভব না। নারীদের সকল ক্ষেত্রে রাখা হচ্ছে। কমিউনিটি পুলিশিং-এ নারীরা আছেন। তাঁদের কথা শুনতে হবে। নারীরা যেন আলোচনা করতে পারে। সরকার যে উদ্দেশ্য নিয়ে কমিউনিটি পুলিশিং করেছে, সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে হবে। জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বপ্ন ছিল পুলিশের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া। তাঁরই ধারাবাহিকতায় আজ দেশ-জাতি সমৃদ্ধির পথে বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এসময় তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ১৫ আগস্টে শহীদ সদস্যদেরকে, জাতীয় চার নেতা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদ এবং দুই লক্ষ মা-বোন, যাঁদের রক্তের বিনিময়ে সর্বোচ্চ ত্যাগে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পৌর মেয়র জাহাঙ্গীর আলম মালিক খোকন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও জেলা কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর কামরুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন, কমিউনিটি পুলিশিং সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব মো. মনিরুজ্জামান।

এ সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজ, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ এবং চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের সকল পদমর্যাদার অফিসার-ফোর্স উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনগণ এবং পুলিশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধাবোধ ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ যেমন-মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, ইভটিজিং ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ সহজতর হয়। সমাজ থেকে মাদক, জঙ্গী, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে পুলিশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে চুয়াডাঙ্গা জেলার ৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর স্বহস্তে লিখিত রচনা মূল্যায়ন শেষে চারটি গ্রুপে বিজয়ী ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অধিকারীদের হাতে পুরষ্কার তুলে দেয়া হয়। পাশাপাশি, ৪র্থ ও ৫ম স্থান অধিকারী এবং অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্যও বিশেষ পুরস্কার দেয়া হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

১০

© All rights reserved © 2020 dailyamaderchuadanga.com