বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

ঘুরে এলাম মক্বা-মদিনা / মক্কা ও তায়েফের ঐতিহাসিক স্থান

ছবি পরিচিতি: আরাফাত ময়দানের নিকট পাহাড়- ‘জমলে রহমত’। এ পাহাড়ে দাঁড়িয়ে বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন হযরত মোহাম্মদ (সা:)। আবার হযরত আদম (আ:) ও হযরত হাওয়া (রা:) এখানে মিলিত হয়েছিলেন।

                    – এমএম আলাউদ্দীন

ধা রাবাহিকভাবে এপ্রিল ১৩,১৪,১৫-এ ফজর, যোহর, মাগরিব, ইশা, তারাবী, তাহাজ্জত, নফল নামাজ, দোয়া-দরুদপড়ার মধ্য দিয়ে সময় কেটেছে। আরিফ সাহেবের সাথে আমি দ্বিতীয় তলায় তাওয়াফ করেছি দু’বার। তাওয়াফটি করেছি মাতা ও দাদী কে স্মরণ করে। আরিফ সাহেবের সাথে অধিকাংশ সময় কাবা শরীফে ও মক্কার অন্যান্য স্থানসমুহে ঘুরেছি। ইফতারী, দু’রিয়েল দিয়ে লাল চা, ৪ রিয়েল দিয়ে দুধ বা কফি পান, রাতের খাবার, সেহরী খাওয়াসহ নানান কাজে আমি ছিলাম তার সঙ্গী। তারপর সোহেল আকরামের সাথে আমি তৃতীয়বার তাওয়াফ করি। তওয়াফ শেষে তার সাথে আমি কাবা শরীফের কম্পাউন্ডে বিভিন্ন ভবন ও সুপার মার্কেট পরিদর্শন করি।
প্রতিটি তাওয়াফের শেষে দু’রাকাত নামাজ কাবা মুখী হয়ে আদায় করেছি। প্রতিদিন নফল নামাজ আদায়, দোয়া-দরুদ পাঠ করেছি। নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়েছি আল্লাহর দরবারে।

মক্বার কিছু ঐতিহাসিক স্থানসমূহ জেয়ারত ও দর্শনের জন্য ১৬ এপ্রিল গাইড সোলাইমানের নেতৃত্বে আমাদের একটি কাফেলা সৌদি বাস যোগে সকাল ৯ টায় যাত্রা শুরু করা হয়েছিল। জাবালে সাওর বা সাওয়র গুহা দর্শন করি। হযরত মোহাম্মদ (সা:) হিজরত করার সময় মক্বা থেকে মদিনায় যাওয়ার পথে প্রাণরক্ষার জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন এখানে। গোহার মুখে কবুতর ডিম পেড়েছিল ও মাকসা জাল বুনিয়েছিল। তাই আক্রমনকারীরা তাকে খুঁজে পায়েছিল না।

আরাফা ময়দানে আমরা উপস্থিত হই। আমাদের বাসটি থামে আরাফায় ময়দানে। ময়দানে নানান ধরণের গাছ রয়েছে। হাজিগণ হজের সময় এখানে তাবুতে অবস্থান করেন। আরাফাত ময়দানের নিকট পাহাড়- ‘জমলে রহমত’। হযরত মোহাম্মদ (সা:) এ পাহাড়ে দাঁড়িয়ে বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। আবার হযরত আদম (আ:) ও হযরত হাওয়া (রা:) এখানে মিলিত হয়েছিলেন। আমরা সকলে এ জায়গাটি দূর থেকে দেখেছিলাম কিন্তু রোদ ও গরমের কারণে পাহাড়ে উঠা সম্ভব হয়নি।

আরাফা ময়দানের সাথে নামিরা মসজিদ। আমাদের গাইড আমাদেরকে এখানে দু’রাকাত নামাজ আদায়ের জন্য বলায় আমরা সকলে দু’রাকাত নামাজ আদায় করেছিলাম।

মুজদালিফা ময়দানে হাজিগণ রাত যাপন করেন। এখান থেকে পাথর সংগ্রহ করেন। এক আজান ও দু’একামতে মাগরিব ও এশার সালাত আদায় করা হয় এখানে। মিনা ময়দান বা মিনা প্রান্তর। ইব্রাহীম আঃ তার প্রিয় সন্তান ইসমাইলকে কোরবানী দেয়ার জন্য এখানে শুয়ায়ে দিয়েছিলেন। কোরবানী দেয়ার সময় সন্তান কোরবানী না হয়ে পশু কোরবানী হয়েছিল। ধীরে চলন্ত বাসে গাইড আমাদেরকে দেখতে বললেন, আমরা বাসে বসেই অবলকন করেছিলাম এগুলো।

এরপর আমরা হাজির হই হিরা গুহায়। যেখানে হযরত মোহাম্মদ (সা:) ধ্যান করতেন। তার স্ত্রী খাদিজা (রা:) তার জন্য খাদ্য নিয়ে যেতেন। আমরা বাস থেকে নেমে গুহাটি দেখলাম কিন্তু গুহাই উঠা হয়নি। এখান থেকে বের হয়ে বাসে বসে জিয়ারত করি খাদিজা (রা:)-এর কবর কারণ বাস স্টপেজ-এর অনুমতি নেই। তারপর ফিরে আসি আমাদের হোটেলে। দুপুরে যোহরের নামাজ আদায় করি হারাম শরীফে। আছর-মাগরীব-ইশা-তারাবি নামজ আদায় করে বাংলাদেশী হোটেল থেকে খাবার কিনে হোটেলে ফিরি। পর্যাপ্ত ভাত, মাঝারি একবাটি গরু/খাশির গোশত, ডাল, আলু ভত্তার মূল্য ১৫ রিয়েল। দু’টি বড় নান রুটি, ডাল/সবজি মূল্য ৮ রিয়েল। ভাত ও মাঝারি এক বাটি উটের গোশত, ডাল মূল্য ২০ রিয়েল।

১৭ এপ্রিল একই নিয়মে ফজর, যোহর, আছর, মাগরির, ইফতার, ইশা, তারাবি সম্পন্ন করে খাদ্য নিয়ে হোটেলে আসা, খাদ্য খাওয়া ও বিশ্রাম নিয়েছিলাম। ১৮ এপ্রিল আমি, সোহেল আকরাম, মরিয়ম, রহিমা খাতুন, মুহ: আরিফ ও মনিরুল ইসলাম ট্যাক্সি ৬০০ রিয়েল চুক্তিতে তায়েফে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে পাহাড়ী পথ। প্রায় ৩ কিলো উপর দিয়ে পাহাড়ী পথ। নিচের দিকে তাকালে প্রাণটা দূর দূরু করছিল। এভাবে চলতে চলতে আমরা হাজির হলাম আাব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস মাজার ও মসজিদে। কবর জিয়ারতের পর আমরা মসজিদে ২ রাকাত নামাজ আদায় করেছিলাম। তারপর কথিত হযরত মুহাম্মদ (সা:) মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে যে বুড়ি রাস্তায় কাটা দিত সেই বুড়ির ধ্বংশাবেশ বাড়ীর দেয়াল, আহত হওয়ার পর হযরত মোহাম্মদ (সা:) বুড়ির বাড়ীর পাশে পাহাড়ের পাদদেশে যে ঘরে অবস্থান করেছিলেন সেঘর ও পাহাড়ের উপরে দন্ডায়মান দু’টি পাথর দেখলাম আমরা। হযরত আলী মসজিদে যাই আমারা সেখানে দু’রাকাত সালাত আদায় করি। রমজানের কারণে দিনে সব মার্কেট বন্ধ দেখলাম। রাস্তায় চলাচল জনশূন্য প্রায়। যাদেরকে দেখা গেল তারা আমাদের মত সফরকারী। এরপর আমরা উপস্থিত হলাম মিকাত জিল মাহরাব-এ। ওজু করলাম। মসজিদে এহরাম পরিধান করলাম। দু’রাকাত সালাত আদায়। উমরা হজের নিয়ত করলাম ও তিনবার তালবিয়া পাঠ করে ট্যাক্সি ক্যাপে উঠলাম। এহরামের সমস্ত নিয়ম কানুন মেনে কাবা শরীফে গেলাম আমরা ৬জন। তাওয়াফ করলাম। প্রচন্ড রোদ কিন্তু আমাদের কোন গরম লাগছে না। খালি পায়ে ৭টি চক্কর দিচ্ছি কিন্তু ফ্লর গরম না। ঠান্ডা অনুভব হচ্ছে। মরিয়মের পায়ে যন্ত্রণা করে এসময় তার কোন যন্ত্রণা বোধ মনে হয় নি। আল্লাহার কাছে শুধু দোয়া চাওয়া, চোখে আশ্রু এটা ছিল আমাদের তাওয়াফের অবস্থা। তারপর মোকামে ইব্রাহীমে দোয়া ও মোকামে ইব্রাহীমের পাশে নির্ধারিত স্থানে হারাম শরীফের দিকে মুখ করে দু’রাকাত সালাত আদায় করি। এরপর সায়ী, মাথা নাড়া করে উমরা হজ্জ্ব পালন করি। এ উমরা টি আমি আমার পিতার নামে পালন করি।

১৯ এপ্রিল বেলা ১১টায় আমি, সোহেল আকরাম একত্রে কাবা শরীফে দ্বিতীয় তলায় তাওয়াফ করি। তারপর হারাম শরীফের নিকটে মক্কা ক্লক রয়েল টাওয়ার, আলরাজ আল বায়েত টাওয়ার ও সুপার মার্কেটসমূহ ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম। এখানে বিভিন্ন দেশের সব ধরণের দ্রব্য পাওয়া যায়।

১৯ এপ্রিল দিনগত রাত ১২:৩০ মিনিটে আমি, মরিয়ম ও সোহেল আকরাম বিদায় তাওয়াফ করার জন্য হারাম শরীফে যায়। হাজীদের উপস্থিতি বেশী। হারাম শরীফের গ্রাউন্ড ফেøারে তাওয়াফ করার সুযোগ পেলাম না। বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠলাম। তাওয়াফ শেষ করলাম। তাওয়াফ করতে আমাদের প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লেগেছিল। তারপর শেষে দু’রাকাত সালাত আদায়। দোয়া করা। বিদায় তাওয়াফের সময় মনের যে আকতি তা ভাষায় প্রকাশ করা দূরহ। এটা শুধু অনুভূতি দিয়ে অনুভব করতে হয়েছিল। এ বিদায় বড় কষ্টের বিদায় ছিল।

২০ এপ্রিল ভোর ৩:৩০ মিনিটে ফজরের নামজ আদায় করতে হারাম শরীফে যায় আমি ও সোহেল আকরাম। ফজরের সালাত শেষ করে আবাসিক হোটেলে আসি। তারপর আবার প্রস্তুত হতে হয় মদিনায় যাওয়ার জন্য।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com