বুধবার, ০৬ Jul ২০২২, ০৪:১৩ পূর্বাহ্ন

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় প্রথম সিরিজ জয় করলো টাইগাররা

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গতকাল বুধবার সেঞ্চুরিয়নে নতুন ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। কিছুদিন আগে যে মাঠে ভারতের মতো শক্তিশালী দলকে প্রোটিয়াদের কাছে হোয়াইটওয়াশ হতে হয়েছে, সেই মাঠেই প্রোটিয়াদের থেকে সিরিজ জয় করল বাংলাদেশ। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে বুধবার স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে টাইগাররা। এ জয়ের মাধ্যমে প্রোটিয়াদের মাটিতে ২-১ ব্যবধানে প্রথম সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল তামিম বাহিনী। প্রোটিয়াদের ১৫৫ রানের জবাবে ১৪১ বল হাতে রেখেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। বোলিংয়ে তাসকিন, ব্যাটিংয়ে তামিম-লিটন স্বাগতিকদের পুরোপুরি নাস্তানাবুদ করেছে। ৩৫ রানের বিনিময়ে ৫ উইকেট লাভের সুবাদে ম্যাচসেরা পুরস্কার পেয়েছেন তাসকিন আহমেদ। এর আগে প্রথম ম্যাচে ৩ উইকেট পাওয়া ঢাকা এক্সপ্রেসখ্যাত তাসকিন আহমেদ পুরো সিরিজে দুর্দান্ত বোলিং নৈপুণ্য প্রদর্শন করায় সিরিজসেরা নির্বাচিত হয়েছেন। সাকিব আল হাসানের শাশুড়ি, মা ও তিন সন্তান অসুস্থ থাকার কারণে আজ বৃহস্পতিবার এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে দেশে ফিরবেন তিনি। ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী অভিনন্দন জানিয়েছেন টাইগারদের।

স্বাগতিকদের ১৫৫ রানের লক্ষ্যমাত্রা তাড়া করতে নেমে দারুণ সূচনা করেছিল দুই উদ্বোধনী ব্যাটার তামিম ইকবাল ও লিটন দাস। প্রোটিয়াদের অন্যতম পেসার কাগিসো রাবাদাসহ লুঙ্গি এনগিদিকেও সমীহ করেনি বাংলার এই দুই বাঘ। প্রথম ওভারেই লিটন দাসের ক্যাচ নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন কেশব মহারাজ। এরপর এই দুই ব্যাটার অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। প্রতি ওভারেই অন্তত একটি করে হলেও বাউন্ডারী রাখার চেষ্টা চালিয়েছেন এ দুজন। ইনিংসের দশম ওভারে রাবাদার এক ওভারে ৪টি বাউন্ডারী হাঁকিয়ে ৬ বলে ১৬ রান আদায় করে নিয়েছেন তামিম ইকবাল। এ দুই উদ্বোধনী দলীয় ৫০ রান করে মাত্র ৫৮ বলে। এরপর তামিম তার ব্যক্তিগত অর্ধশত তুলে নেন মাত্র ৫২ বলের সাহায্যে। ৯টি চারের সাহায্যে ব্যক্তিগত ৫০ রান পূর্ণ করেছেন টাইগার অধিনায়ক। দীর্ঘ ৮ মাস পর টাইগারদের অধিনায়ক ব্যক্তিগত অর্ধশতকের দেখা পেয়েছেন গতকাল। এই অর্ধশতকের মাধ্যমে ২২৫ ম্যাচে ৫২তম অর্ধশতক হাঁকালেন চট্টগ্রামের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র। এরপর দলীয় ১০০ রান পূর্ণ করেন ১৮তম ওভারের প্রথম বলে।

তাবরিজ শামসির বলে তামিম ইকবাল এগিয়ে এসে লং অফ দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছায় টাইগাররা। ২১তম ওভারের পঞ্চম বলে হাফ সেঞ্চুরির আক্ষেপ নিয়ে সাজঘরে ফিরেন লিটন দাস। অর্ধশতকের জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র ২ রান। কেশব মহারাজকে লং অফ দিয়ে খেলতে গিয়ে প্রোটিয়া অধিনায়ক টেম্বা বাভুমার হাতে বন্দি হন লিটন। তামিম-লিটনের পার্টনারশিপে এসেছিল ১২৭ রান। ২৫.৪ ওভারে দলীয় ১৫০ রান পূর্ণ করেন তামিম-সাকিব। এরপর বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে নিয়ে কাক্সিক্ষত জয় নিশ্চিত করেন তামিম ইকবাল। ২৭তম ওভারের তৃতীয় বলে চার মেরে শেষ হাসি হাসেন সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। শেষ পর্যন্ত ৮৭ রানে তামিম ইকবাল ও ১৮ রানে সাকিব আল হাসান অপরাজিত ছিলেন। ১৪১ বল হাতে রেখেই সিরিজ নিশ্চিত করে টাইগাররা। এই সিরিজের আগে স্বাগতিকদের মাটিতে কোনো জয় ছিল না টাইগারদের। অধরা জয়ের লক্ষ্যে এ সিরিজে প্রথম ম্যাচেই দাপুটে জয় তুলে নেয় তামিম বাহিনী। দ্বিতীয় ম্যাচে হারলেও তৃতীয় ম্যাচে আবার তাসকিন-তামিমের দাপটে প্রোটিয়াদের মাটিতে সিরিজ জয় করে নিল বাংলাদেশ। এ জয়ের ফলে আইসিসি সুপার লিগে ১২০ পয়েন্ট নিয়ে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ১৮ ম্যাচে ১২০ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে তামিম বাহিনী।

ম্যাচের প্রথম ইনিংসে তাসকিন আহমেদের ৫ উইকেটের সুবাদে ৩৭ ওভারে ১৫৪ রানে গুটিয়ে যায় প্রোটিয়াদের ইনিংস। সেঞ্চুরিয়নে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন প্রোটিয়া অধিনায়ক টেম্বা বাভুমা। স্বাগতিকদের দুই উদ্বোধনী ব্যাটার প্রথম ৬ ওভার টাইগার বোলারদের শাসন করে খেললেও সপ্তম ওভার থেকেই উইকেটের পতন হতে শুরু করে। ৪১ বলে তাদের ৪৫ রানের জুটি ভাঙেন মেহেদী হাসান মিরাজ। মিরাজের অফস্পিনকে তুলে মারতে গিয়ে লং অফে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাতে ধরা পড়েন কুইন্ট ডি কক। আউট হওয়ার আগে ২ চারের সাহায্যে তিনি করেন ১২ রান। প্রথম উইকেট পতনের পর ওপেনার জানেমন মালান ও কাইল ভেরেনি উইকেটে থিতু হওয়ার চেষ্টা করেন। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ২০ রান যোগ করার পরই আঘাত হানেন তাসকিন আহমেদ। ১৩তম ওভারে এসে কাইল ভেরনিকে ব্যক্তিগত ৯ রানে সাজঘরে ফেরান তিনি। তাসকিনের ওয়াইড ডেলিভারি টেনে উইকেটে এনে বোল্ড হন ভেরেনি। এক ওভার পর ১৫তম ওভারে এসে ওপেনার মালানকে ফেরান তিনি। সাজঘরে ফেরার আগে ৭ চারের সাহায্যে খেলেন ৩৯ রানের ইনিংস। পরের ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক টেম্বা বাভুমাকে ব্যক্তিগত ২ রানে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলেন সাকিব আল হাসান। রিভিউ নিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি প্রোটিয়া অধিনায়কের। ১৯তম ওভারের প্রথম বলেই প্রোটিয়া ব্যাটিংয়ের অন্যতম ভরসা ভ্যান ডার ডুসেনকে আউট করেন শরিফুল। ডুসেন আকাশে বল ভাসিয়ে দিলে পয়েন্টে দারুণ ক্যাচ লুফে নেন মিরাজ। এরপর ইনিংসের ২৫তম ওভারে প্রিটোরিয়াসকে সাজঘরে ফেরান মুশফিকুর রহিমের ক্যাচ বানিয়ে। প্রোটিয়া শিবিরে তাসকিন পরবর্তী আঘাত হানেন ইনিংসের ২৯তম ওভারে। তৃতীয় বলে ডেভিড মিলার ও শেষ বলে কাগিসো রাবাদাকে উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ খ্যাত মুশফিকুর রহিমের ক্যাচে পরিণত করেন তিনি। এই দুই উইকেটের বিনিময়ে ১০ ওভারে ৩৫ রানের বিনিময়ে ৫ উইকেট পেয়েছেন তাসকিন। এই তাসকিন তার অভিষেক ম্যাচে ২০১৪ সালে ভারতের বিপক্ষে ৮ ওভারে ২৮ রান দিয়ে ৫ উইকেট শিকার করেছিলেন। প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে অভিষেক ম্যাচে ৫ উইকেট শিকার করেন তিনি। তারপর মোস্তাফিজুর রহমান ২০১৫ সালে সেই ভারতের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে ৫ উইকেট শিকার করেন।

গতকাল দক্ষিণ আফ্রিকার অন্য ৪টি উইকেটের মধ্যে শরিফুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ নেন একটি করে এবং সাকিব আল হাসান নেন ২টি উইকেট। শেষ ব্যাটার রান আউট হন। দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যাটারদের মধ্যে শেষ দিকে ডেভিড মিলার ১৬, প্রিটোরিয়াস ২০, কাগিসো রাবাদা ৪ ও লুঙ্গি এনগিদি শূন্য রানে আউট হন। প্রোটিয়াদের ব্যাটিং ইনিংসে ধস নামানোর জন্য টাইগারদের যে গতি তারকা অসাধারণ অবদান রেখেছেন, তিনি হলেন তাসকিন আহমেদ। তাসকিন এ ম্যাচ খেলার আগে ৪৭টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ২০১৫ রান খরচ করে ৬২টি উইকেট পেয়েছেন। ক্যারিয়ারে তার বেস্ট বোলিং ফিগার ভারতের বিপক্ষে। অভিষেক ম্যাচে মিরপুরে ২৮ রানের বিনিময়ে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ২০১৪ সালেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এবং টেস্ট ফরম্যাটে ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টাইগারদের এই পেসারের অভিষেক হয়েছে। বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকার তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের গতকাল ছিল শেষ ম্যাচ। প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ৩৮ রানে জয়ী হয়। দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচে স্বাগতিকরা ৭ উইকেটে বাংলাদেশকে হারিয়ে সিরিজে ১-১ এ সমতা আনে। গতকাল তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com