মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন

সংগীতভক্তদের সুরের মায়াজালে বেঁধে রাখা অনন্য প্রতিভাময়ী ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিল্পীর থেমে গেল পথ চলা

কিংবদন্তি এক সুর সম্রাজ্ঞীর মাহাপ্রায়ণ,

লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে শোকাতুর বিশ্ব

‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে, দূরের তারার পানে চেয়ে/আমার নয়ন দু’টি শুধুই তোমারে চাহে/ব্যথার বাদলে যায় ছেয়ে’- সত্যি-সত্যিই তিনি চলে গেলেন তারাদের দেশে-চির অনির্বাণ হয়ে, ব্যথার বাদল ঝরিয়ে। পাড়ি দিলেন নক্ষত্রলোকের পথে। তিনি কোকিলকণ্ঠী লতা মঙ্গেশকর। সাত দশকেরও বেশী সময় ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতভক্তদের সুরের মায়াজালে বেঁধে রাখা এই অনন্য প্রতিভাময়ী ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিল্পীর সুরের পথ চলা থেমে গেল। গতকাল রবিবার ভারতের দক্ষিণ মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যান তিনি।

শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে শুরু করে রোমান্টিক গান, এমনকি ভজনও গেয়েছেন তিনি। সব গানেই পেয়েছেন দর্শক-সমালোচকদের সাধুবাদ। লতাকে ‘সুরসম্রাজ্ঞী’ বলেও ডাকেন কেউ কেউ। আবার অনেকের বিচারে তিনি ভারতের সর্বকালের সেরা সংগীতশিল্পীদেরও একজন।

করোনাভাইরাসে আক্রাক্ত হলে গত ৯ জানুয়ারী ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল লতা মঙ্গেশকরকে। করোনাভাইরাসমুক্ত হওয়ার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল। কিন্তু পরে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। অবস্থার অবনতি হলে শনিবার তাকে আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয়। শনিবার সন্ধ্যায় তাকে দেখতে হাসপাকতালে যান বোন আশা ভোঁসলে। বলিউডের আরো অনেকেই ছুটে যান এই মহাতারকার খোঁজ নিতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই জানান শুভকামনা। কিন্তু সবাইকে শোকে ভাসিয়ে চিরবিদায় নিলেন তিনি।

অর্ধশতাব্দীরও বেশী সময় ধরে ৩৫টিরও বেশী ভারতীয় ভাষায় গান গেয়েছিলেন তিনি। তবে, শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশে পারিবারিক নাম হয়ে উঠেছিলেন। ৭৩ বছরেরও বেশী সময় ধরে লতা মঙ্গেশকর তার জাদুকরী কণ্ঠ দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন।

চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শুরু করা লতা অল্প সময়েই হয়ে উঠেছিলেন ইন্ডাস্ট্রির অপরিহার্য একটি নাম। গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতার যেমন বলেছিলেন, ভারতীয় সিনেমার গান মানেই লতা মঙ্গেশকর। বিদেশী ভাষাতেও তিনি গান করেছেন।

এদিকে, দীর্ঘ সাত দশক ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পীর মৃত্যুতে ভারতে দুদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার। প্রিয় শিল্পীর চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না ভক্তরা। লতার চলে যাওয়ায় শোকবার্তায় ছেয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
ভারতরত্ন লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুুরী। তারা প্রখ্যাত এ সংগীতশিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শোকবার্তায় লতা মঙ্গেশকরের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় বলেন, এই সুরসম্রাজ্ঞীর মৃত্যুত উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। লতা মঙ্গেশকর তার কর্মের মধ্য দিয়ে চিরদিন এ অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী তার আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। তারা শোকবার্তায় বলেন, কিংবদন্তি শিল্পী লতার প্রয়াণে ভারতের সংস্কৃতি জগতে অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।

এদিকে, ভারতীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে মুম্বাইয়ের নিজ বাড়ি ‘প্রভুকুঞ্জ’ থেকে স্থানীয় সময় পৌনে ৬টার দিকে লতা মঙ্গেশকরের মৃতদেহ শিবাজি পার্কে নিয়ে যাওয়া হয়। মৃতদেহ পৌঁছানোর আগে থেকেই সেখানে বাজানো হয় এই কোকিলকণ্ঠীর জনপ্রিয় গানগুলো।

এই কোকিলকণ্ঠীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ বিভিন্ন অঙ্গনের তারকা, ভক্ত এবং বিশিষ্টজনরা। তাদের মধ্যে ছিলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে, এনসিপি নেতা শরদ পাওয়ার, এমএনএস প্রধান রাজ ঠাকরে, অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, সচিন টেন্ডুলকার, সংগীত জগতের আরেক কিংবদন্তি আশা ভোঁসলে, উষা মঙ্গেশকরসহ মঙ্গেশকর পরিবারের সদস্যরা।
লতা মঙ্গেশকরের জন্ম ১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ইন্দোর শহরে। আগে নাম ছিল হেমা। তবে মৃত বড় বোনের নাম লতিকা হওয়ায় তার নাম হয়ে যায় লতা। বাবা দীনানাথ মুঙ্গেশকর ছিলেন ধ্রপদ শিল্পী, মারাঠি থিয়েটারের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি। তার কাছেই লতার গান শেখার শুরু। কৈশোরেই বাবাকে হারালেও গান শেখা ছাড়েননি। সেসব দিনে ওস্তাদ আমান আলী খানের কাছে ক্ল্যাসিকাল শিখতেন লতা। ১৯৪২ সালে ‘কিটি হাসাল’ নামে এক মারাঠি সিনেমায় তার প্লেব্যাক ক্যারিয়ার শুরু। তখন কে এল সায়গল, শামশাদ বেগম ও নুরজাহানদের যুগ। শুরুর দিকে লতা মঙ্গেশকরকে শুনতে হয়েছিল, তার কণ্ঠস্বর একটু বেশিই পাতলা। তাকে প্রথম সুযোগ দেন মাস্টার গুলাম হায়দার। তার পরেই আসে ‘মহল’-এর সেই বিখ্যাত গান ‘আয়েগা আনেওয়ালা’। সেই সিনেমা ১৬ বছরের মধুবালা ও ২০ বছরের লতা, দুজনের জন্যই ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। নায়িকা ও গায়িকার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে ওই সিনেমার পর। সেই পথ ধরেই লতার কণ্ঠ হয়ে ওঠে বলিউডের ‘গোল্ডেন ভয়েস’।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 dailyamaderchuadanga.com