সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:০৯ অপরাহ্ন

বৃষ্টিতে ভিজল দেশ, শীতে জবুথবু

কথায় আছে, ‘মাঘের শীত বাঘের গায়’। শেষমেশ তার প্রতিফলন ঘটল মাঘের শেষের দিকে এসে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর ঠাণ্ডায় জবুথবু হয়ে পড়েছে জনজীবন। উষ্ণতার চাদর মুড়িয়ে যখন ঘুমে ব্যস্ত শহরবাসী, তখনই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভিজেছে চুয়াডাঙ্গাবাসী। শীতের রাতে হঠাৎ বৃষ্টির অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতায় পড়েছিল শহরবাসী। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও হিম বাতাসে এখানে জেঁকে বসেছে শীত। এতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। খেটে খাওয়া মানুষ বাড়ী থেকে বের হতে না পারায় কাজে যোগ দিতে পারে নি। ফলে, তারা চরম বিপাকে পড়েছে। মাঘের এই শীতে বৃষ্টি হয়েছে চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। চুয়াডাঙ্গায় আবহাওয়ার মেজাজ একই। সূর্যের আলো মেলেনি কোথাও। তবে, বিকেলের দিকে অর্থাৎ বেলা সাড়ে ৪টার দিকে এক ঝলক সূর্যের রশ্মির দেখা মেলে।

সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে ছিল কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস। দুপুর না গড়াতেই ঘনিয়ে আসে আঁধার-যেন কালবৈশাখীর রূপ! পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে এমন ঝড়-বৃষ্টি বলে ধারণা আবহাওয়া অধিদপ্তরের। আর কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এটি ফসলের জন্য আশীর্বাদ।

তাদের মতে, দীর্ঘ খরা ও বৃষ্টিহীন শীতে প্রকৃতি যখন রুক্ষ হয়ে ওঠে, তখন হালকা বর্ষণ ফসলের জন্য উপকার বয়ে আনে। এই বৃষ্টি হাসি ফুটাবে কৃষকের মুখে।

এদিকে, মাঘের শীতের তীব্রতার মধ্যে বৃষ্টির হানায় ভোগান্তি বেড়েছে মানুষের। শুক্রবার ভোর থেকে বৃষ্টির কারণে শ্রমজীবী মানুষ কর্মস্থলে যেতে পারেন নি; তাই ছুটির দিনে রাস্তাঘাটও ছিল প্রায় ফাঁকা।

এদিকে বৃষ্টির কারণে দুর্ঘটনা এড়াতে শহরের বিভিন্ন সড়কে যানবাহনগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। বৃষ্টি ও শীতের হাত থেকে একটু উষ্ণতা পাওয়ার জন্য খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করেন অনেকে।

কাজে বের হতে না পেরে বিপাকে পড়েন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের লোকজন। বৃষ্টির কারণে আলু খেতে ছত্রাক আক্রমণের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইজিবাইক চালক পৌর এলাকার রেলপাড়ার সুজন জানান, ‘রাস্তায় বের হইছি কিন্তু যাত্রী পাচ্ছি না। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও মালিকের জমা রোজগার করতে পারি নাই। পরিবারের জন্য খাবার কিনবো কি দিয়ে।’

উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রামের আব্দুস ছাত্তার জানান, ৪০০ টাকার দৈনিক মজুরিতে ধানের চারা লাগানোর কাজে এসেছিলাম। কিন্তু বৃষ্টি আর তীব্র ঠান্ডার কারণে কাজ না করে বাড়ী ফিরে যাচ্ছি।’

পথচারী আরমান হোসেন পলাশ জানান, সকালে বাড়ী থেকে বের হলেও প্রচণ্ড শীতের কারণে বাড়ীতে ফিরে যেতে হচ্ছে।

আবহাওয়াবিদ ড. মুহম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশ গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করে। ফলে, শনিবার (আজ) দুপুর পর্যন্ত আকাশ মেঘলা থাকতে পারে। বৃষ্টি হতে পারে ক’একটি জায়গায়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এছাড়া, হালকা থেকে মাঝারী ধরণের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও মাঝারী ধরণের ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেব্রুয়ারী মাসে সামগ্রিকভাবে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মাসের শেষ দিকে দেশের কোথাও কোথাও ১ থেকে ২ দিন শিলাবৃষ্টি এবং বজ্রসহ ঝড়বৃষ্টি হতে পারে।

আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক আরও বলেন, এই বৃষ্টিপাতের মূল কারণ পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এবং দেশের ভেতরে থাকা গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘপুঞ্জ। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে এসেছে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। সেগুলো আগে থেকে দেশের ভেতরে থাকা গুচ্ছ মেঘপুঞ্জের সম্মিলনে বজ্রমেঘের সৃষ্টি করে। এর ফলে বৃহস্পতিবার রাত থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। প্রথমে হালকা থাকলেও শুক্রবার সকাল থেকে এর তীব্রতা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তা মাঝারী আকার ধারণ করে। এই বৃষ্টি কালও (শনিবার) চলতে পারে। এরপরে তিন-চারদিনের আরেক দফা শীত নামবে। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের কোনো কোনো স্থানে তা শৈত্যপ্রবাহে রূপ নিতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানিয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা, ঢাকা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে পঞ্চগড়, বদলগাছী, নীলফামারী, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, যশোর, মাদারীপুর ও ঢাকায় মাঝারী আকারের বর্ষণ হয়।

গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বেচ্চ বৃষ্টি হয়েছে খুলনায় ৪৫ মিলিমিটার। এছাড়া দিনাজপুর ৪১, তাড়াশ ও ঈশ্বরদীতে ৩৫, রংপুরে ৩৪, বদলগাছীতে ৩১, রাজারহাট ও বগুড়ায় ২৯, রাজশাহীতে ২৫, গোপালগঞ্জ ২৬, টাঙ্গাইলে ২৩, চুয়াডাঙ্গা, ডিমলা ও সৈয়দপুরে ২২, সাতক্ষীরায় ২০, চাঁদপুর ১৯, বরিশালে ১৮, কুমারখালীতে ১৫, মাদারীপুরে ১৩, মোংলা ১২, ফরিদপুর ও ঢাকায় ১১, যশোরে ৯, তেতুলিয়ায় ৭, নিকলিতে ৫, শ্রীমঙ্গল ও কুমিল্লায় ৩, ভোলা ও সিলেটে ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া খেপুপাড়ায় সামান্য বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরণের বৃষ্টি হতে পারে।

সেই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের নদী অববাহিকায় মাঝারী থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। আজ সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও দিনের তাপমাত্রা দুই-তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে।

এই মেঘ ক্রমান্বয়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দিকে চলে যেতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরণের ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এই মেঘ-মেদুর পরিস্থিতি কালই (শনিবার) শেষ হয়ে যেতে পারে। তবে, ক’একদিন কুয়াশার প্রকোপ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে হালকা থেকে মাঝারী ধরণের কুয়াশা পড়তে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

১০

© All rights reserved © 2020 dailyamaderchuadanga.com