বুধবার, ১০ অগাস্ট ২০২২, ০২:২৯ পূর্বাহ্ন

দুই বাংলার মিলনমেলা , চোখের জলে ভিজল নিঠুর কাঁটাতার

ভৌগোলিক সীমারেখা আলাদা করে রেখেছে পাশাপাশি দুদেশের মানুষকে। কিন্তু আলাদা করতে পারেনি হৃদয়ের টান। কংক্রিটের পিলারে জড়িয়ে থাকা কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করতে না দিলেও স্বজনদের সঙ্গে চোখের দেখায় বাধা হতে পারেনি। ক্ষণিকের এ সময়ে আনন্দে-আবেগে গাল বেয়ে নেমে আসে নোনা জল। হয় কুশলবিনিময়। কিন্তু পরস্পরকে ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য হয় না কেউ কারোর।

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মাকড়হাট ক্যাম্পের ৩৪৬ পিলারসংলগ্ন টেংরিয়া গোবিন্দপুর গ্রামের কুলিক নদীর পারে কয়েক যুগ ধরে পাথরকালি মেলার আয়োজন করছে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা। কালীপূজার পর বসে এ আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী মেলাকে ঘিরে একদিনের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। দুই বাংলার মানুষ আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেন। মেলায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন জিনিসপত্রও কেনেন তারা। জমুরকালী (পাথরকালী) জিউপূজা উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও গতকাল শুক্রবার সকালে পূজার আয়োজন করেছিল পূজা উদযাপন কমিটি। তবে এবার আগের মতো দুই বাংলার সীমান্তে হয়নি লাখো মানুষের মিলনমেলা। বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে কাঁটাতারের কাছে কোনো মানুষজনকে ভিড় জমাতে দেয়নি ভারতীয় সীমান্ত রক্ষাবাহিনী। ফলে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারার আক্ষেপ নিয়েই ফিরতে হয় অনেককে।

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বাউরাবাজার এলাকা থেকে আসা নাজমা বেগম বলেন, ‘ভারতে ভাই-ভাবি বসবাস করেন। তাই তাদের সঙ্গে দেখা করতে এই কাঁটাতারের বেড়ার কাছে এসেছিলাম। করোনার কারণে দুবছর দেখা হয়নি।’ দিনাজপুরের বড়খাতা ইউনিয়ন থেকে আসা সুদর্শন বলেন, ‘ভারতে আমার ভাগ্নি থাকে। তাদের সঙ্গে দুবছর পর দেখা করতে এসেছিলাম। কিন্তু করোনার অজুহাতে এবারও দেখা করতে দেওয়া হয়নি।’

নীলফামারীর জলঢাকা থেকে ভারতে বসবাস করা ছেলেকে দেখতে এসেছিলেন বৃদ্ধা মধুবালা। তিনি কেঁদে কেঁদে জানালেন, ‘টাকার অভাবে ভারতে যেতে পারি না, তাই খবর পেয়ে এলাম ছেলেকে দেখতে; না দেখেই ফিরে যাচ্ছি। আমাদের মতো অভাবী মানুষদের জন্য সীমান্তে স্বজনদের যেন দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়।’ রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে আসা বাকলী রানী (৫৭), চন্দ চাঁদ রায় (৬০), আমল (৪৭)সহ বিভিন্ন এলাকার অনেকেই জানান, সকাল থেকে তারা স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। দুপুর গড়িয়ে বেলা শেষ হয়ে এলেও দেখা করতে পারেননি। করোনা ভাইরাসের কারণে সব বন্ধ। তাদের আত্মীয়রা ওপারে অপেক্ষায় ছিলেন, কাঁটাতারের কাছে আসতে পারেননি। আক্ষেপের সুরে বৃদ্ধ চন্দ চাঁদ রায় বললেন, ‘এবার পূজা করেই বাড়ি যাচ্ছি। আগামী বছর দেখা করার অপেক্ষায় রইলাম।’

জানা যায়, হরিপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকা এক সময় ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুরের অধীনে ছিল। দেশ বিভক্তির কারণে আত্মীয়স্বজনরাও হয়ে যান দুই দেশের। সারা বছর তারা দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারেন না। তাই অপেক্ষায় থাকেন কালীপূজার পরের শুক্রবার পাথরকালি মেলার এ দিনের জন্য। এ মিলনমেলাতে দুদেশের হিন্দুধর্মাবলম্বী ছাড়াও শত শত মুসলমানও আসেন, ওপারে থাকা স্বজনদের কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁকে একনজর দেখার জন্য। প্রিয়জনকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। স্পর্শ করতে না পারার কষ্টে চোখের জলে ভেজান নিঠুর কাঁটাতার। এবারও সকালে হাসিমুখে দেখা করতে এসে বিকালে বিদায়বেলায় ফিরেছেন কাঁদতে কাঁদতেই।

পূজা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নগেন কুমার পাল বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের কারণে মিলনমেলা করা সম্ভব হয়নি এবার। শুধু পূজা হয়েছে।’ এ বিষয়ে ভাঁতুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাজান সরকার বলেন, ‘দুই বাংলার এই সম্পর্ক যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তবে করোনার কারণে দুবছর ধরে মিলনমেলা হয়নি।’

হরিপুরের গোবিন্দপুর ও চাপাসার ক্যাম্পে কর্মরত সীমান্ত বাহিনীরা জানান, করোনা ভাইরাসের কারণে এবার মিলনমেলা বন্ধ করে দিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। কাঁটাতারের কাছে কোনো বাংলাদেশি যেন না যায়, সে বিষয়েও আমাদের অনুরোধ করেছিলেন তারা। যদিও অনেকেই সীমান্তে ছুটে গেছেন প্রিয় স্বজনের মুখটি একবার দেখবেন বলে। সূত্র: আমাদের সময়

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com