বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে গ্রাম ও শহরপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হাত ধরে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার তেমনই এক উদীয়মান তরুণ বিজ্ঞানমনস্ক ও উদ্ভাবক মো. সানজিদ খান। নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী তার নিজস্ব মেধা, পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে গাইবান্ধার নাম উজ্জ্বল করেছেন।
ব্যক্তিগত অর্জন ও সাফল্য:পলাশবাড়ী সুতি মাহমুদ মডেল পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সানজিদ খান অতি অল্প বয়সেই বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘ইবনে আল-হাইছাম সাইন্স ফেস্ট ২০২৪’-এ রংপুর বিভাগের মধ্যে ১ম স্থান এবং সমগ্র বাংলাদেশে ২৩তম স্থান অর্জন করে গাইবান্ধা জেলার জন্য বিরল গৌরব বয়ে নিয়ে আসেন।
এছাড়া তিনি জাতীয় হাইস্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা (NHSPC), জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ, বাংলাদেশ জুনিয়র সাইন্স অলিম্পিয়াড (BDJSO), বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অলিম্পিয়াড এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় সায়েন্স কার্নিভালে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে প্রশংসিত হয়েছেন।
তরুণ উদ্ভাবকের রোবোটিক্স প্রজেক্ট:সানজিদ খান শুধু তাত্ত্বিক বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং বাস্তব জীবনে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন এমবেডেড সিস্টেম ও রোবোটিক্স প্রজেক্ট তৈরি করেছেন। তার তৈরি উল্লেখযোগ্য প্রজেক্টগুলোর মধ্যে রয়েছে:
জিপিএস গাইডেন্স রোভার (GPS-guided Rover): স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবস্থান শনাক্ত করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম।
অ্যালকোহল ডিটেকশন ও অটোমেটেড ইঞ্জিন লকিং সিস্টেম: চালক মদ্যপ অবস্থায় থাকলে গাড়ির ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে, যা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
'সায়েন্টিফিক নলেজ অব বাংলাদেশ (SKBD)' প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা:শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আলো ছড়িয়ে দিতে সানজিদ খান প্রতিষ্ঠা করেন "Scientific Knowledge of Bangladesh (SKBD)" নামে একটি বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক সংগঠন। সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য হলো—প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড এবং রোবোটিক্স প্রতিযোগিতার জন্য দক্ষ করে তোলা।
সংগঠনের নেতৃত্ব ও পরিচালনা পরিষদ:
প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক: মো. সানজিদ খান
প্রধান উপদেষ্টা: মো. আবু জাফর (উপজেলা আইসিটি অফিসার, পলাশবাড়ী)সভাপতি: মো. শাহরিয়ার আহমেদ শুভ,সিনিয়র সহ-সভাপতি: সাদনান রহমান সাদাত,সাধারণ সম্পাদক: সিয়াদ,বিশেষায়িত রোবোটিক্স উইং: TUX BYTE,সায়েন্স প্রজেক্ট তৈরিতে অসামান্য অবদান:
সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন বাস্তবমুখী ও উদ্ভাবনী সায়েন্স প্রজেক্ট (Science Projects) তৈরিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অবদানমূলক ভূমিকা পালন করেছেন ক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি সাদনান রহমান সাদাত এবং সাধারণ সম্পাদক সিয়াদ। তাদের নিরলস পরিশ্রম, নতুন চিন্তাধারা এবং কারিগরি সহযোগিতার ফলেই একের পর এক সফল বিজ্ঞান প্রজেক্ট বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে।মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও প্রশাসনিক স্বীকৃতি:
সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পলাশবাড়ী উপজেলায় শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমুখী করতে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে:১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত এবং উপজেলা প্রশাসন (ইউএনও অফিস) ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের সার্বিক দিকনির্দেশনায় পলাশবাড়ী উপজেলার ৬২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ৯টি কলেজে সায়েন্স ক্যাম্পেইন, সেমিনার ও ওয়ার্কশপ পরিচালনার কাজ চলছে।২. প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ: সাধারণ শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স ও কোডিং-এর প্রাথমিক ধারণা প্রদান করা হচ্ছে।৩. জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব: 'বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬'-এ গাইবান্ধা জেলার প্রতিনিধিত্ব এবং অংশগ্রহণ করছে SKBD পরিবার।
তৃণমূল পর্যায়ে বিজ্ঞান চর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ ও উত্তরাঞ্চলের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে SKBD-এর প্রতিষ্ঠাতা মো. সানজিদ খান জানান, "আমাদের লক্ষ্য হলো পলাশবাড়ীসহ পুরো গাইবান্ধার শিক্ষার্থীদের আগামী দিনের প্রযুক্তি ও রোবোটিক্সের উপযোগী করে গড়ে তোলা, যাতে তারা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। বরাবরই উত্তরবঙ্গ এবং যথাক্রমে গাইবান্ধা জেলা শিক্ষার দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে; এই সকল দিক থেকে উত্তরবঙ্গ এবং গাইবান্ধাকে শিক্ষা ও প্রযুক্তি বিপ্লবের মাধ্যমে উন্নত করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে SKBD।"
উপজেলা প্রশাসন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা তরুণ এই উদ্ভাবক ও তার সংগঠনের সার্বিক সাফল্য কামনা করেছেন এবং বিজ্ঞান বিপ্লবে তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।