
হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত পরিবর্তনশীল জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
হিমবাহ গলে যাওয়া, পারমাফ্রস্ট নরম হয়ে পড়া এবং হিমবাহ হ্রদের পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে বড় ধরনের বন্যা, ভূমিধস ও আকস্মিক জলপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশসহ হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আট দেশের বিস্তীর্ণ জনপদে।
বাংলাদেশ ছাড়াও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চীন, আফগানিস্তান ও মিয়ানমার। গত ২৬ আগস্ট নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গবেষকদের মতে, হিমবাহের পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে পূর্বে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত উজান ও ভাটি অঞ্চলে এর প্রভাব পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি), ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন এবং পরিবেশবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিস্টেমিকের বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে।
গলে যাচ্ছে হিমবাহ, নরম হচ্ছে জমাট মাটি
গবেষকরা বলছেন, হিমালয়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটি ও বরফের স্তর বা পারমাফ্রস্ট নরম হয়ে পড়ছে। এতে পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে।
একই সঙ্গে হিমবাহের পানি জমে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। পাহাড় থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানি নদীর প্রবাহ বাড়িয়ে ভাটি অঞ্চলের জনবসতি ও অবকাঠামোর ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
সিস্টেমিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের প্রায় ৪০ হাজার হিমবাহের মধ্যে মাত্র ২১টি সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে দুর্গম এলাকায় তৈরি হওয়া অনেক ঝুঁকি সময়মতো শনাক্ত করা কঠিন।
১০ নদীর পানির উৎস হিমালয়
হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চল থেকে এশিয়ার ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আমু দরিয়া, সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, ইরাবতী, সালউইন, মেকং, ইয়াংসি, হলুদ নদী ও তারিম।
এসব নদীর অববাহিকায় প্রায় ২০০ কোটি মানুষ বসবাস করে। তাদের পানীয় জল, কৃষি, জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নদীগুলোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর গঙ্গা পদ্মা নামে পরিচিত। আর তিব্বতে উৎপন্ন ব্রহ্মপুত্র চীন ও ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এসে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়েছে।
আইসিআইএমওডির তথ্য অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় প্রায় ১১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের বসবাস। তাদের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ বাংলাদেশে। ফলে হিমালয়ের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের পানি, কৃষি ও নদীকেন্দ্রিক জনজীবনেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
বাড়ছে হিমবাহ হ্রদ ভেঙে বন্যার আশঙ্কা
সিস্টেমিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভারতের অংশেই প্রায় ২০০টি হিমবাহ হ্রদ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬টি অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ডিরেক্টর ও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক অরুশি চোপড়া বলেন, হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটবে কি না, এখন সেই প্রশ্নের চেয়ে কখন ঘটবে—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আইসিআইএমওডির ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১০ থেকে ২০১৯ সময়ে হিমবাহ গলার হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
গবেষকদের মতে, হিমালয়ের পরিবর্তনকে শুধু পাহাড়ি অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। কারণ হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর পানি কোটি কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব হিমালয়ের বরফ ও জমাট মাটিতেও পড়ছে। এতে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে বন্যা ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
নরওয়ের হিমবাহবিজ্ঞানী মিরিয়াম জ্যাকসনের মতে, ক্রায়োস্ফিয়ার বা পৃথিবীর বরফাচ্ছাদিত অংশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এসব ঝুঁকির কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।
নজরদারি ও আগাম সতর্কতার তাগিদ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের প্রতিটি হিমবাহ পর্যবেক্ষণ করা বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি জোরদার করতে হবে।
এ জন্য স্যাটেলাইট তথ্য, রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি, পাহাড়ের শিলার নড়াচড়া শনাক্তকারী সেন্সর এবং হিমবাহ হ্রদের পানির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিশেষ করে যেসব হিমবাহের নিচে জলবিদ্যুৎ বাঁধ, শহর কিংবা বড় জনবসতি রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং সীমান্ত পেরিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকরা।
কারণ হিমালয় থেকে নেমে আসা পানি কোনো সীমান্ত মানে না। তাই উজানে ঘটে যাওয়া কোনো বিপর্যয়ের প্রভাব ভাটিতে পৌঁছাতে পারে কয়েকটি দেশের সীমানা পেরিয়ে। এ বাস্তবতায় আগাম সতর্কতা, দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং যৌথ প্রস্তুতিকেই সম্ভাব্য প্রাণহানি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।