
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তপাতের পর দেশ নতুন পথচলার সুযোগ পেয়েছে। এখন মূল দায়িত্ব গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, তবে সংঘাতে না জড়িয়ে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সুস্থ ধারার রাজনীতিচর্চা করতে হবে। বিভেদ ভুলে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠীর সবাইকে একসঙ্গে সমঅধিকার নিয়ে বাঁচার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
রোববার বেলা সাড়ে ৩টায় ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। ২৩তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজ জেলায় এটি তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর। এ উপলক্ষ্যে তাকে এই সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতি হিসাবে মির্জা ফখরুলের আগমন উপলক্ষ্যে প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এ সংবর্ধনা কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানস্থল পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
দুপুর থেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঠাকুরগাঁওসহ পার্শ্ববর্তী জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ছুটে আসেন প্রিয় নেতাকে বরণ করতে। বিকাল সাড়ে ৩টায় ধর্মীয় গ্রন্থের বাণী পাঠ এবং সংগ্রামী জীবনের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতিকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হুমায়ুন কবির ও জালাল উদ্দিন আহমেদ। তার সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন জিন্নাতুন নেছা ও সেলিমা আক্তার। ?সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. আবু মোহাম্মদ খয়রুল কবির অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। এ সময় মির্জা ফখরুলকে ‘গণতন্ত্রের কালপুরুষ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দেন রাষ্ট্রপতি। বিকাল ৫টা ২৩ মিনিটে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি আঞ্চলিক ভাষায় জনতাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মুই জানু তোমরা মোক ভালোবাসেন, তোমরা ক্যাঙ্গাতি আছেন?’ তার মুখে নিজেদের ভাষা শুনে ভিন্নরকম আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
জনতার উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, আপনারা আমাকে নির্বাচিত করেছেন, দল ও পার্লামেন্ট আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। আমি চেষ্টা করেছি সেই আস্থার মর্যাদা রাখতে। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠাকুরগাঁওয়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন হচ্ছে। মেডিকেল কলেজের জায়গা চূড়ান্ত হয়েছে, আগামী বছর থেকেই শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হবে। বন্ধ থাকা শিবগঞ্জ বিমানবন্দর চালু হবে।
শেষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাকে যে দায়িত্বে বসানো হয়েছে তাতে জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। তবে আমার হৃদয় সবসময় ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গেই থাকবে। মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক-আমি তোমাদেরই লোক। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য দেন-ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, সংসদ-সদস্য ডা. আবদুস সালাম, জাহিদুর রহমান ও মনজুরুল হক প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইএসডিওর নির্বাহী পরিচালক ড. মুহাম্মদ শহীদ উজ জামান। এর আগে দুপুরে দুদিনের সফরে বিশেষ হেলিকপ্টারযোগে ঠাকুরগাঁওয়ের শহীদ মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়ামে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি। সেখানে স্থানীয় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী ফুল দিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানান। এরপর সড়কপথে সার্কিট হাউজে পৌঁছালে রাষ্ট্রপতিকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি পিতা-মাতার কবর জিয়ারত করেন এবং মোনাজাত করেন। পরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক জানান, সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার সকালে রাষ্ট্রপতি ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
বাবার ঠাকুরগাঁও সফর নিয়ে ড. শামারুহ মির্জার আবেগঘন বার্তা : রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলামের নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও সফর ও নাগরিক সংবর্ধনা কেন্দ্র করে ফেসবুকে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন তার বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জা। বিষয়টি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় পদের চেয়েও তার কাছে বাবার পরিচয়ই সবার ওপরে। রোববার ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘আজ (রোববার) আব্বু ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন নাগরিক সংবর্ধনায়। খুব মিস করছি আমি। ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা অন্তহীন।’ এক সাংবাদিকের সঙ্গে সাম্প্রতিক কথোপকথনের স্মৃতি শেয়ার করে তিনি লেখেন, ‘কদিন আগে এক রিপোটার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হাউ ডু ইউ ফিল, অ্যাজ এ প্রেসিডেন্টস ডটার? আমি বললাম, প্রেসিডেন্ট অর নট, হি ইজ অলওয়েজ মাই আব্বু, মাই হিরো!’ পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকের মন ছুঁয়েছে।