হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছিলেন প্রিয় সন্তানের জন্য। পথপানে চেয়ে থাকা মায়ের আশা ছিল, ছেলে এলেই বুঝি বুকের ভেতরটা শান্ত হবে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস! মায়ের সঙ্গে আর দেখা হলো না চাকুরিজীবী ফরিদ আলির। মাকে দেখার আগেই মাঝপথে হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তিনি।
হাসপাতালের বেডে অসুস্থ মা যখন সন্তানের পথ চেয়ে গুনছিলেন প্রহর, তখন চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাইরে অপেক্ষা করছিল সন্তানের নিথর দেহ। মায়ের চোখের জল আর সন্তানের চিরবিদায়ের এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা এলাকায় এক শোকাবহ ও স্তব্ধ পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত ফরিদ আলি (৫০) চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার নাটুদহ ইউনিয়নের চারুলিয়া গ্রামের প্রখ্যাত ও প্রয়াত শিক্ষক নজরুল ইসলাম মাস্টারের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। কর্মব্যস্ততার কারণে ঢাকায় অবস্থান করলেও গ্রামের বাড়ি এবং পরিবারের প্রতি তার টান ছিল অপরিসীম।
সম্প্রতি তার ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা তীব্র অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে তাকে দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর ঢাকাতে পৌঁছানো মাত্রই ফরিদ আলির হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। প্রিয় মাকে একনজর দেখতে এবং তার সেবার উদ্দেশ্যে সব কাজ ফেলে জরুরি ভিত্তিতে চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফরিদ আলি যখন দামুড়হুদা বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছান, তখন মায়ের চিকিৎসাধীন থাকা হাসপাতালটি ছিল মাত্র ঢিলছোড়া দূরত্বে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাসপাতালে যাওয়ার পথেই তিনি দামুড়হুদা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন পাবলিক টয়লেটে প্রবেশ করেন। সেখানে অবস্থানকালেই হঠাৎ তিনি তীব্র 'ব্রেন স্ট্রোক' বা হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং আর বের হতে পারেননি।
বেশ কিছু সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও তিনি বের না হওয়ায় স্থানীয় লোকজনের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। পরবর্তীতে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। দ্রুত তাকে পাশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকদের ধারণা, অতিরিক্ত গরম, দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি কিংবা আকস্মিক উচ্চ রক্তচাপের কারণে তিনি স্ট্রোকের শিকার হয়েছেন।
ফরিদ আলির মৃত্যুর খবর যখন হাসপাতালে পৌঁছায়, তখন চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। যে মা হাসপাতালের বেডে শুয়ে ছেলের আসার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, তার কাছে এই খবর পৌঁছানো মাত্রই তিনি স্তব্ধ হয়ে যান। বৃদ্ধা মায়ের আহাজারি ও বুকফাটা কান্না উপস্থিত চিকিৎসক, নার্স এবং সাধারণ রোগীদের চোখকেও অশ্রুসিক্ত করে তোলে।
"ছেলে আমাকে দেখতে আসছিল, এখন আমি কাকে দেখব? আল্লাহ আমাকে না নিয়ে কেন আমার ছেলেকে নিয়ে গেল?" — হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বৃদ্ধা মায়ের এমন আকুল আর্তনাদ পুরো চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ঢাকায় চাকরি করলেও ফরিদ আলির স্বভাব-চরিত্র ছিল অত্যন্ত বিনয়ী ও অমায়িক। চারুলিয়া গ্রামের মানুষের কাছে তার ও তার প্রয়াত শিক্ষক বাবার পরিবারের একটি আলাদা সম্মান ছিল। এই অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুর খবর তার নিজ গ্রামে পৌঁছালে সেখানে এক সুনসান নীরবতা নেমে আসে। শত শত মানুষ চুয়াডাঙ্গা সদর ও দামুড়হুদা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ভিড় জমান প্রিয় মুখটিকে শেষবারের মতো দেখতে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফরিদ আলির মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি চারুলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
নিয়তির এই নির্মম পরিহাস যেন মনে করিয়ে দেয় জীবনের অনিশ্চয়তাকে। মায়ের অসুস্থতা আর সন্তানের চিরবিদায়ের এই গল্প কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি পুরো সমাজকে স্তব্ধ করে দেওয়া এক চিরন্তন ট্র্যাজেডি।