০১:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচন

১৪ বছর পর ক্ষমতায় লেবার পার্টি, প্রধানমন্ত্রী স্টারমার

  • অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৩:১০:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ জুলাই ২০২৪
  • ৬৮ Time View

ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিলেন ঋষি সুনাক ॥ অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনার চিঠি


  • লেবার ৪১২ ও কনজারভেটিভ পেয়েছে ১২১ আসন
  • ২০০ বছরের মধ্যে খারাপ ফল রক্ষণশীলদের 
  • ফিলিস্তিনপন্থি পাঁচ প্রার্থীর জয়ে উল্লাস

যুক্তরাজ্যে নির্বাচনে পালাবদলের ইঙ্গিত আগে থেকেই ছিল। সময় এগোতেই স্পষ্ট হয়েছে লেবারের জয়, কনজারভেটিভের পরাজয়। টানা ১৪ বছর পর ব্রিটেনের মসনদ থেকে বিদায় নিল কনজারভেটিভ পার্টি এবং ক্ষমতায় ফিরল মধ্যপন্থি লেবার পার্টি। সেই সঙ্গে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হলেন কেইর স্টারমার। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই মন্ত্রিসভা গঠন শুরু করেন স্টারমার। তিনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে র্যাচেল রিভসকে নিয়োগ দিয়েছেন। দেশটির ৮০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী অর্থমন্ত্রী হলেন। উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অ্যাঙ্গেলা রায়েনার।

১৪ বছরের অপেক্ষার অবসান: টোরি নেতা তথা ব্রিটেনের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের স্থলাভিষিক্ত হলেন কেইর স্টারমার। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সে মোট আসন ৬৫০। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ‘জাদুসংখ্যা’ ৩২৬। বুথফেরত সমীক্ষাকে সত্যি প্রমাণ করে গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত ৬৪৮ আসনের মধ্যে ৪১২টি গেছে লেবার পার্টির ঝুলিতে। টোরিরা ১২১ আসন এবং অন্যরা পেয়েছে ১১৫টি আসন। ভোটের ফল স্পষ্ট হতেই সুনাক অভিনন্দন জানান তার উত্তরসূরি স্টারমারকে। এরপরে প্রথা মেনে বাকিংহাম প্রাসাদে গিয়ে রাজা তৃতীয় চার্লসকে ভোটের ফলাফল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেন। এমনকি শিগিগরই দলের নেতৃত্ব থেকেও পদত্যাগ করবেন বলে জানান। এরপর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে ফিরে বিদায়ি বক্তৃতা করেন তিনি। অন্যদিকে, বিজয়ী দলের নেতা স্টারমার সে সময় বাকিংহাম প্রাসাদে রাজার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গড়ার আমন্ত্রণ আনতে যান। এর পর ডাউনিং স্ট্রিটের সেই ‘১০’ লেখা কালো দরজার সামনে বক্তৃতা করেন তিনি। পেশায় আইনজীবী লেবার নেতা বলেন, ‘আজ থেকেই পরিবর্তনের পালা শুরু হলো ব্রিটেনে’। নির্বাচনে জয়ের পর এবং রাজার কাছ থেকে দায়িত্ব নিয়ে আসার পর দুই দফা বক্তব্য দেন স্টারমার। তিনি বলেন, ১৪ বছর পর দেশ তার ভবিষ্যৎ ফিরে পেয়েছে। জনগণের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেন, ‘আপনারা এটির জন্য প্রচার করেছেন। সবকিছুই আপনারা শুরু করেছিলেন। আপনারাই ভোট দিয়েছেন। এবার আমাদের ফিরিয়ে দেওয়ার পালা।’

উল্লেখ্য, গত মে মাসে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক আগেই হঠাৎ করে নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন ঋষি সুনাক। তার এই সিদ্ধান্তে প্রতিপক্ষের পাশাপাশি নিজের দলও অবাক হয়েছিল খুব। তিনি ভেবেছিলেন এর ফলে লেবারদের সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। কিন্তু তার প্রচার সেভাবে মাথা তুলতে পারেনি। অন্যদিকে, স্টারমার পরিবর্তনের যে সরল বার্তা দিয়েছিলেন তা ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কে এই স্টারমার: আইনজীবী হিসেবে বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের পর স্যার কিয়ের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এমপি হন পঞ্চাশের কোঠায় এসে। তবে রাজনীতি নিয়ে তার বরাবরই আগ্রহ ছিল। যুবা অবস্থায় তিনি ছিলেন উগ্র বামপন্থি। ১৯৬২ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে একজন স্টারমার বেড়ে ওঠেন দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের সারে-তে। শ্রমজীবী শ্রেণির সঙ্গে তার জীবনের যোগের কথা প্রায়শই বলতে শোনা যায় স্যার কেইরকে। তার বাবা একটা কারখানার সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক হিসেবে কাজ করতেন এবং মা ছিলেন নার্স। ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির স্থানীয় যুব শাখায় যোগ দেন স্টারমার। কিছু সময়ের জন্য উগ্র বামপন্থি একটি পত্রিকার সম্পাদনাও করেছিলেন। স্যার কিয়ের তার পরিবারের প্রথম সদস্য যিনি শিক্ষা লাভ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন। লিডস এবং অক্সফোর্ডে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যারিস্টার হিসেবে মানবাধিকার নিয়ে কাজও করেছেন। তিনি প্রথম বার পার্লামেন্টে যান ২০১৫ সালে।

অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনার চিঠি :এদিকে, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় লেবার পার্টি নেতা কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুক্রবার নবনির্বাচিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ওই চিঠি পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন।

চিঠিতে কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আপনার যোগ্য নেতৃত্বে লেবার সরকারের সঙ্গে আমাদের দুই কমনওয়েলথ দেশের পারস্পরিক স্বার্থের আলোকে দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জলবায়ু এবং কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করার প্রতীক্ষায় আছে আমার সরকার।’

এদিকে, ভোটে ‘পরিবর্তনের’ ডাক দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে একসঙ্গে কাজ করার বার্তা পাঠাচ্ছেন বিশ্ব নেতারা।

কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার পার্টির ‘ঐতিহাসিক বিজয়ের’ কথা তুলে চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই দ্ব্যর্থহীন ম্যান্ডেট আপনাদের দেশকে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির নতুন উচ্চতায় নিতে এবং বিশ্বব্যাপী শান্তির প্রসারে আপনার নেতৃত্বের প্রতি ব্রিটিশ জনগণের বিশ্বাস ও আস্থার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করছে।’

একইসঙ্গে একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে লেবার পার্টি এবং এ দলের প্রবাদপ্রতিম নেতা স্যার হ্যারল্ড উইলসন, টমাস উইলিয়ামস এবং লর্ড পিটার শোরের সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের বন্ধুত্বের কথাও স্মরণ করেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সভাপতি, বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সামগ্রিক ও প্রগতিশীল আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

অংশীদারত্বের পাশাপাশি দুই দেশের কল্যাণে বাংলাদেশ-বংশোদ্ভূত ব্রিটিশদের কাজে লাগানোর ইচ্ছার কথা তুলে ধরে চিঠিতে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আমাদের দুই দেশের সর্বজনীন কল্যাণের জন্য সাত লাখের বেশি প্রাণবন্ত ও উদ্যোগী ব্রিটিশ-বাংলাদেশির অমূল্য অবদানকে কাজে লাগানো অব্যাহত রাখতে চাই।’

ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিলেন ঋষি সুনাক: এদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাজা তৃতীয় চার্লস। অন্যদিকে কনজারভেটিভ পার্টির প্রধানের পদ থেকেও সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন সদ্য সাবেক এই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।

রাজা চার্লসের দপ্তর বাকিংহাম প্যালেস সুনাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে এক বিবৃতিতে জানায়, শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক রাজার শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। মহামান্য রাজা তা সানন্দে গ্রহণ করেছেন।

অন্যদিকে নিজের কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের পদত্যাগের কথা নিশ্চিত করে সুনাক বলেন, ‘জনগণের প্রতি আমার প্রথম কথা, আমি দুঃখিত। সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে আমি আমার কাজ করেছি। কিন্তু আপনারা স্পষ্টভাবে যুক্তরাজ্যে সরকারের পরিবর্তন চেয়েছেন। আপনাদের এই রায়ের পর আর কোনো কথা হয় না।’

কনজারভেটিভ পার্টির ঐতিহাসিক পরাজয়ের দায়ভার মাথায় নিয়ে সুনাক বলেন, ‘আমি আপনাদের (ভোটারদের) ক্ষোভ, অসন্তোষের কথা শুনতে পেয়েছি। আমি এই পরাজয়ের দায়ভার গ্রহণ করছি।’

পরাজয় মেনে নিয়ে জয়ী লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে সুনাক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পদে তার সাফল্য আমাদের সবার সাফল্য বলে বিবেচিত হবে। আমি তার ও তার পরিবারের কল্যাণ কামনা করছি। নির্বাচনী প্রচারণায় আমাদের যা-ই মতবিরোধ হোক না কেন, তিনি একজন শালীন ও জনগণবান্ধব ব্যক্তি। আমি তাকে সম্মান করি।’

নিজের অর্জনের কথা উল্লেখ করে সুনাক বলেন, ‘আমরা ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে এনেছি। আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাজ্যের সুনাম বাড়িয়েছি। এসব অর্জনের জন্য আমি গর্বিত। ২০ মাস আগের তুলনায় এই দেশ অনেক বেশি নিরাপদ ও শক্তিশালী।’

এশীয় বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সুনাক বলেন, ‘যুক্তরাজ্য সম্পর্কে একটি বিস্ময়কর জিনিস হলো, আমার দাদি-দাদা সামান্য সহায়-সম্পত্তি নিয়ে এখানে আসার মাত্র দুই প্রজন্মের মধ্যে আমাদের (অভিবাসীর পরিচয়) গৌণ হয়ে পড়ে। আমি প্রধানমন্ত্রী হলাম। আমার দুই কিশোরী মেয়ে ডাউনিং স্ট্রিটে (হোলি উৎসবে) দীপাবলি জ্বালাল।’

সমর্থন ও ত্যাগ স্বীকার করায় পরিবারকে ধন্যবাদ দিয়ে বক্তৃতা শেষ করেন সুনাক। এরপর স্ত্রী অক্ষতা মূর্তির হাত ধরে ডাউনিং স্ট্রিটে অপেক্ষায় থাকা একটি গাড়ির দিকে এগিয়ে যান ভারতীয় বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের প্রথম এই প্রধানমন্ত্রী।

সুনাকের পূর্বসূরি লিস ট্রাসকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় পদত্যাগ করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে ২০২২ সালের অক্টোবরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হন ঋষি সুনাক। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এখন আলোচনায়

রঘুনাথপুরে জামায়াতে ইসলামীর পথসভা: জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান

যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচন

১৪ বছর পর ক্ষমতায় লেবার পার্টি, প্রধানমন্ত্রী স্টারমার

আপডেট সময় : ০৩:১০:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ জুলাই ২০২৪

ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিলেন ঋষি সুনাক ॥ অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনার চিঠি


  • লেবার ৪১২ ও কনজারভেটিভ পেয়েছে ১২১ আসন
  • ২০০ বছরের মধ্যে খারাপ ফল রক্ষণশীলদের 
  • ফিলিস্তিনপন্থি পাঁচ প্রার্থীর জয়ে উল্লাস

যুক্তরাজ্যে নির্বাচনে পালাবদলের ইঙ্গিত আগে থেকেই ছিল। সময় এগোতেই স্পষ্ট হয়েছে লেবারের জয়, কনজারভেটিভের পরাজয়। টানা ১৪ বছর পর ব্রিটেনের মসনদ থেকে বিদায় নিল কনজারভেটিভ পার্টি এবং ক্ষমতায় ফিরল মধ্যপন্থি লেবার পার্টি। সেই সঙ্গে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হলেন কেইর স্টারমার। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই মন্ত্রিসভা গঠন শুরু করেন স্টারমার। তিনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে র্যাচেল রিভসকে নিয়োগ দিয়েছেন। দেশটির ৮০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী অর্থমন্ত্রী হলেন। উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অ্যাঙ্গেলা রায়েনার।

১৪ বছরের অপেক্ষার অবসান: টোরি নেতা তথা ব্রিটেনের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের স্থলাভিষিক্ত হলেন কেইর স্টারমার। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সে মোট আসন ৬৫০। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ‘জাদুসংখ্যা’ ৩২৬। বুথফেরত সমীক্ষাকে সত্যি প্রমাণ করে গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত ৬৪৮ আসনের মধ্যে ৪১২টি গেছে লেবার পার্টির ঝুলিতে। টোরিরা ১২১ আসন এবং অন্যরা পেয়েছে ১১৫টি আসন। ভোটের ফল স্পষ্ট হতেই সুনাক অভিনন্দন জানান তার উত্তরসূরি স্টারমারকে। এরপরে প্রথা মেনে বাকিংহাম প্রাসাদে গিয়ে রাজা তৃতীয় চার্লসকে ভোটের ফলাফল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেন। এমনকি শিগিগরই দলের নেতৃত্ব থেকেও পদত্যাগ করবেন বলে জানান। এরপর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে ফিরে বিদায়ি বক্তৃতা করেন তিনি। অন্যদিকে, বিজয়ী দলের নেতা স্টারমার সে সময় বাকিংহাম প্রাসাদে রাজার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গড়ার আমন্ত্রণ আনতে যান। এর পর ডাউনিং স্ট্রিটের সেই ‘১০’ লেখা কালো দরজার সামনে বক্তৃতা করেন তিনি। পেশায় আইনজীবী লেবার নেতা বলেন, ‘আজ থেকেই পরিবর্তনের পালা শুরু হলো ব্রিটেনে’। নির্বাচনে জয়ের পর এবং রাজার কাছ থেকে দায়িত্ব নিয়ে আসার পর দুই দফা বক্তব্য দেন স্টারমার। তিনি বলেন, ১৪ বছর পর দেশ তার ভবিষ্যৎ ফিরে পেয়েছে। জনগণের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেন, ‘আপনারা এটির জন্য প্রচার করেছেন। সবকিছুই আপনারা শুরু করেছিলেন। আপনারাই ভোট দিয়েছেন। এবার আমাদের ফিরিয়ে দেওয়ার পালা।’

উল্লেখ্য, গত মে মাসে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক আগেই হঠাৎ করে নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন ঋষি সুনাক। তার এই সিদ্ধান্তে প্রতিপক্ষের পাশাপাশি নিজের দলও অবাক হয়েছিল খুব। তিনি ভেবেছিলেন এর ফলে লেবারদের সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। কিন্তু তার প্রচার সেভাবে মাথা তুলতে পারেনি। অন্যদিকে, স্টারমার পরিবর্তনের যে সরল বার্তা দিয়েছিলেন তা ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কে এই স্টারমার: আইনজীবী হিসেবে বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের পর স্যার কিয়ের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এমপি হন পঞ্চাশের কোঠায় এসে। তবে রাজনীতি নিয়ে তার বরাবরই আগ্রহ ছিল। যুবা অবস্থায় তিনি ছিলেন উগ্র বামপন্থি। ১৯৬২ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে একজন স্টারমার বেড়ে ওঠেন দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের সারে-তে। শ্রমজীবী শ্রেণির সঙ্গে তার জীবনের যোগের কথা প্রায়শই বলতে শোনা যায় স্যার কেইরকে। তার বাবা একটা কারখানার সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক হিসেবে কাজ করতেন এবং মা ছিলেন নার্স। ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির স্থানীয় যুব শাখায় যোগ দেন স্টারমার। কিছু সময়ের জন্য উগ্র বামপন্থি একটি পত্রিকার সম্পাদনাও করেছিলেন। স্যার কিয়ের তার পরিবারের প্রথম সদস্য যিনি শিক্ষা লাভ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছেন। লিডস এবং অক্সফোর্ডে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যারিস্টার হিসেবে মানবাধিকার নিয়ে কাজও করেছেন। তিনি প্রথম বার পার্লামেন্টে যান ২০১৫ সালে।

অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনার চিঠি :এদিকে, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় লেবার পার্টি নেতা কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুক্রবার নবনির্বাচিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ওই চিঠি পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন।

চিঠিতে কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আপনার যোগ্য নেতৃত্বে লেবার সরকারের সঙ্গে আমাদের দুই কমনওয়েলথ দেশের পারস্পরিক স্বার্থের আলোকে দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জলবায়ু এবং কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করার প্রতীক্ষায় আছে আমার সরকার।’

এদিকে, ভোটে ‘পরিবর্তনের’ ডাক দিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে একসঙ্গে কাজ করার বার্তা পাঠাচ্ছেন বিশ্ব নেতারা।

কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার পার্টির ‘ঐতিহাসিক বিজয়ের’ কথা তুলে চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই দ্ব্যর্থহীন ম্যান্ডেট আপনাদের দেশকে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির নতুন উচ্চতায় নিতে এবং বিশ্বব্যাপী শান্তির প্রসারে আপনার নেতৃত্বের প্রতি ব্রিটিশ জনগণের বিশ্বাস ও আস্থার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করছে।’

একইসঙ্গে একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে লেবার পার্টি এবং এ দলের প্রবাদপ্রতিম নেতা স্যার হ্যারল্ড উইলসন, টমাস উইলিয়ামস এবং লর্ড পিটার শোরের সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের বন্ধুত্বের কথাও স্মরণ করেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সভাপতি, বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সামগ্রিক ও প্রগতিশীল আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

অংশীদারত্বের পাশাপাশি দুই দেশের কল্যাণে বাংলাদেশ-বংশোদ্ভূত ব্রিটিশদের কাজে লাগানোর ইচ্ছার কথা তুলে ধরে চিঠিতে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আমাদের দুই দেশের সর্বজনীন কল্যাণের জন্য সাত লাখের বেশি প্রাণবন্ত ও উদ্যোগী ব্রিটিশ-বাংলাদেশির অমূল্য অবদানকে কাজে লাগানো অব্যাহত রাখতে চাই।’

ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিলেন ঋষি সুনাক: এদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাজা তৃতীয় চার্লস। অন্যদিকে কনজারভেটিভ পার্টির প্রধানের পদ থেকেও সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন সদ্য সাবেক এই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।

রাজা চার্লসের দপ্তর বাকিংহাম প্যালেস সুনাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে এক বিবৃতিতে জানায়, শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক রাজার শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। মহামান্য রাজা তা সানন্দে গ্রহণ করেছেন।

অন্যদিকে নিজের কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের পদত্যাগের কথা নিশ্চিত করে সুনাক বলেন, ‘জনগণের প্রতি আমার প্রথম কথা, আমি দুঃখিত। সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে আমি আমার কাজ করেছি। কিন্তু আপনারা স্পষ্টভাবে যুক্তরাজ্যে সরকারের পরিবর্তন চেয়েছেন। আপনাদের এই রায়ের পর আর কোনো কথা হয় না।’

কনজারভেটিভ পার্টির ঐতিহাসিক পরাজয়ের দায়ভার মাথায় নিয়ে সুনাক বলেন, ‘আমি আপনাদের (ভোটারদের) ক্ষোভ, অসন্তোষের কথা শুনতে পেয়েছি। আমি এই পরাজয়ের দায়ভার গ্রহণ করছি।’

পরাজয় মেনে নিয়ে জয়ী লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমারকে অভিনন্দন জানিয়ে সুনাক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পদে তার সাফল্য আমাদের সবার সাফল্য বলে বিবেচিত হবে। আমি তার ও তার পরিবারের কল্যাণ কামনা করছি। নির্বাচনী প্রচারণায় আমাদের যা-ই মতবিরোধ হোক না কেন, তিনি একজন শালীন ও জনগণবান্ধব ব্যক্তি। আমি তাকে সম্মান করি।’

নিজের অর্জনের কথা উল্লেখ করে সুনাক বলেন, ‘আমরা ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে এনেছি। আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাজ্যের সুনাম বাড়িয়েছি। এসব অর্জনের জন্য আমি গর্বিত। ২০ মাস আগের তুলনায় এই দেশ অনেক বেশি নিরাপদ ও শক্তিশালী।’

এশীয় বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সুনাক বলেন, ‘যুক্তরাজ্য সম্পর্কে একটি বিস্ময়কর জিনিস হলো, আমার দাদি-দাদা সামান্য সহায়-সম্পত্তি নিয়ে এখানে আসার মাত্র দুই প্রজন্মের মধ্যে আমাদের (অভিবাসীর পরিচয়) গৌণ হয়ে পড়ে। আমি প্রধানমন্ত্রী হলাম। আমার দুই কিশোরী মেয়ে ডাউনিং স্ট্রিটে (হোলি উৎসবে) দীপাবলি জ্বালাল।’

সমর্থন ও ত্যাগ স্বীকার করায় পরিবারকে ধন্যবাদ দিয়ে বক্তৃতা শেষ করেন সুনাক। এরপর স্ত্রী অক্ষতা মূর্তির হাত ধরে ডাউনিং স্ট্রিটে অপেক্ষায় থাকা একটি গাড়ির দিকে এগিয়ে যান ভারতীয় বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের প্রথম এই প্রধানমন্ত্রী।

সুনাকের পূর্বসূরি লিস ট্রাসকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় পদত্যাগ করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে ২০২২ সালের অক্টোবরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হন ঋষি সুনাক। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।