০১:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই সেতুর অভাবে ৫৪ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি চরবাসীর

দিন বদলের সঙ্গে বদলেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যবস্থা। উন্নত হয়েছে যোগাযোগ, পরিবর্তন এসেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থায়। তবে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম চরবাসীর জীবন-মানের পরিবর্তন হয়নি। তারা এখনো পায়ে হেঁটে অথবা গরু বা ঘোড়ার গাড়িতে করে উপজেলা ও জেলা শহরে যান।

শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। বন্যা বা বর্ষায় সে পথও রুদ্ধ হয়ে যায়। পদ্মা নদী বেষ্টিত এ এলাকায় থাকা খালের ওপর দুটি ব্রিজের অভাবে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। আশ্বাস মিললেও দীর্ঘ ৫৪ বছরে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

দৌলতপুর উপজেলা শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন। পদ্মা নদী বেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় এখানকার লক্ষাধিক মানুষের জীবন যাত্রা এখনো পুরোনো ধারায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে তাদের গরু-মহিষ বা ঘোড়ার গাড়িতে চলাচল করতে হয়। বর্ষা বা বন্যায় নৌকা হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র যোগাযোগের বাহন। চরাঞ্চলের মানুষের যুগোপযোগী হতে প্রয়োজন ভাগজোত ও সুকার ঘাটে দুটি ব্রিজ।

স্থানীয়দের মতে, বছরের পর বছর ধরে প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে আজও উন্নয়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। আধুনিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে ভারত সীমান্তঘেঁষা রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের কৃষি নির্ভর বিস্তীর্ণ জনপদ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্বাচন এলেই উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি মেলে, ভোট শেষে তা আর আলোর মুখ দেখে না।

দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী অফিস সূত্রে জানা গেছে, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাগজোত ঘাটে ৩৫০ মিটার এবং চিলমারী ইউনিয়নের সুকারঘাটে মাত্র ৯৬ মিটার দীর্ঘ দুটি ব্রিজ নির্মাণের জন্য সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বরাদ্দ চেয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের ভাগজোত ও সুকারঘাট ব্রিজ নির্মাণের অন্যতম নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল। পাশাপাশি চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিসহ নানা ধরণের আশ্বাস ছিল অহরহ।

স্থানীয় শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান বলেন, “আমি বর্তমানে ঢাকায় একটি কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি। আমার বাড়ি রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর চরে। বন্যার সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই খারাপ থাকে যে প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া সম্ভব হতো না। পানি বাড়লে প্রায় ছয় মাস শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকতো। আমার পরিবারের সামর্থ্য ছিল বলে ঢাকায় পড়তে যেতে পেরেছি, কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা সেখানেই থেমে যাচ্ছে। দ্রুত ব্রিজ দুটি নির্মাণ হলে এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।”

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ভাগজোত ও সুকারঘাটে দুটি ব্রিজ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় আমরা শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে অনেক পিছিয়ে আছি। বর্ষাকালে নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেঁটে কিংবা গরু-মহিষ বা ঘোড়ার গাড়ি অথবা মোটরসাইকেলে চলাচল করতে হয়। লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত ব্রিজ নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে।”

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “এই দুই ইউনিয়নের শিশুরা সঠিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। বন্যার সময় স্কুল ও রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যায়। বছরের প্রায় ৬ মাস শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় শিক্ষকরা এখানে চাকরি করতে আগ্রহী হন না। কেউ এলেও কিছুদিন পর বদলি নিয়ে চলে যান। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে।”

তিনি বলেন, “এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। উপজেলা সদর হাসপাতাল প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তার মধ্যেই মারা যান। কৃষকরাও ন্যায্যমূল্যে ফসল বিক্রি করতে পারেন না। নৌকা কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে করে ফসল বাজারে নিতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়।”

এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আসাদুল্লাহ বাচ্চু বলেন, “ব্রিজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বাজেটে অনুমোদন পেলেই নিয়ম অনুযায়ী কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, “ভাগজোত ও সুকারঘাটে ব্রিজ এবং নদী ভাঙন আমার উপজেলার অন্যতম বড় সমস্যা। বিষয়টি আমি সংসদে উত্থাপন করেছি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে ডিও লেটারও দিয়েছি। দ্রুত ব্রিজ নির্মাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

Tag :
এখন আলোচনায়

দুই সেতুর অভাবে ৫৪ বছরেও ভাগ্য বদলায়নি চরবাসীর

আপডেট সময় : ০২:১৫:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

দিন বদলের সঙ্গে বদলেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যবস্থা। উন্নত হয়েছে যোগাযোগ, পরিবর্তন এসেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থায়। তবে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম চরবাসীর জীবন-মানের পরিবর্তন হয়নি। তারা এখনো পায়ে হেঁটে অথবা গরু বা ঘোড়ার গাড়িতে করে উপজেলা ও জেলা শহরে যান।

শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। বন্যা বা বর্ষায় সে পথও রুদ্ধ হয়ে যায়। পদ্মা নদী বেষ্টিত এ এলাকায় থাকা খালের ওপর দুটি ব্রিজের অভাবে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। আশ্বাস মিললেও দীর্ঘ ৫৪ বছরে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

দৌলতপুর উপজেলা শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন। পদ্মা নদী বেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় এখানকার লক্ষাধিক মানুষের জীবন যাত্রা এখনো পুরোনো ধারায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে তাদের গরু-মহিষ বা ঘোড়ার গাড়িতে চলাচল করতে হয়। বর্ষা বা বন্যায় নৌকা হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র যোগাযোগের বাহন। চরাঞ্চলের মানুষের যুগোপযোগী হতে প্রয়োজন ভাগজোত ও সুকার ঘাটে দুটি ব্রিজ।

স্থানীয়দের মতে, বছরের পর বছর ধরে প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে আজও উন্নয়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। আধুনিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে ভারত সীমান্তঘেঁষা রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের কৃষি নির্ভর বিস্তীর্ণ জনপদ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্বাচন এলেই উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি মেলে, ভোট শেষে তা আর আলোর মুখ দেখে না।

দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী অফিস সূত্রে জানা গেছে, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাগজোত ঘাটে ৩৫০ মিটার এবং চিলমারী ইউনিয়নের সুকারঘাটে মাত্র ৯৬ মিটার দীর্ঘ দুটি ব্রিজ নির্মাণের জন্য সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বরাদ্দ চেয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের ভাগজোত ও সুকারঘাট ব্রিজ নির্মাণের অন্যতম নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল। পাশাপাশি চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিসহ নানা ধরণের আশ্বাস ছিল অহরহ।

স্থানীয় শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান বলেন, “আমি বর্তমানে ঢাকায় একটি কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি। আমার বাড়ি রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর চরে। বন্যার সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই খারাপ থাকে যে প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া সম্ভব হতো না। পানি বাড়লে প্রায় ছয় মাস শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকতো। আমার পরিবারের সামর্থ্য ছিল বলে ঢাকায় পড়তে যেতে পেরেছি, কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা সেখানেই থেমে যাচ্ছে। দ্রুত ব্রিজ দুটি নির্মাণ হলে এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।”

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ভাগজোত ও সুকারঘাটে দুটি ব্রিজ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় আমরা শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে অনেক পিছিয়ে আছি। বর্ষাকালে নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেঁটে কিংবা গরু-মহিষ বা ঘোড়ার গাড়ি অথবা মোটরসাইকেলে চলাচল করতে হয়। লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত ব্রিজ নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে।”

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “এই দুই ইউনিয়নের শিশুরা সঠিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। বন্যার সময় স্কুল ও রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যায়। বছরের প্রায় ৬ মাস শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় শিক্ষকরা এখানে চাকরি করতে আগ্রহী হন না। কেউ এলেও কিছুদিন পর বদলি নিয়ে চলে যান। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে।”

তিনি বলেন, “এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। উপজেলা সদর হাসপাতাল প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তার মধ্যেই মারা যান। কৃষকরাও ন্যায্যমূল্যে ফসল বিক্রি করতে পারেন না। নৌকা কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে করে ফসল বাজারে নিতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়।”

এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আসাদুল্লাহ বাচ্চু বলেন, “ব্রিজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বাজেটে অনুমোদন পেলেই নিয়ম অনুযায়ী কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, “ভাগজোত ও সুকারঘাটে ব্রিজ এবং নদী ভাঙন আমার উপজেলার অন্যতম বড় সমস্যা। বিষয়টি আমি সংসদে উত্থাপন করেছি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে ডিও লেটারও দিয়েছি। দ্রুত ব্রিজ নির্মাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”