০২:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইনস্টাগ্রামে স্বপ্নের প্রেম, ‍বিয়ে এড়াতে হবু স্বামীকে পাহাড় থেকে ফেলে হত্যা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সম্পর্ক ছিল নিখুঁত প্রেমের গল্পের মতো। বাগদান, ফুলের তোড়া, আলিঙ্গন, নাচ, ভালোবাসার বার্তা- সব মিলিয়ে যেন রূপকথার সম্পর্ক। কিন্তু সেই সম্পর্কের অন্তরালে তৈরি হচ্ছিল এক ভয়াবহ হত্যার ষড়যন্ত্র।

ভারতের মহারাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান কেতন বিশাল আগারওয়ালের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাগদত্তা সিয়া গোয়াল এবং তার কথিত প্রেমিক চেতন বাবুলাল চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সিয়া ও কেতন তাদের বাগদানের ঘোষণা দেন। আগামী নভেম্বর মাসে রাজকীয় আয়োজনে তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। অতিথিদের পরিবহনের জন্য দুটি প্রাইভেট বিমান ভাড়া করা হয়েছিল এবং বিয়ের জন্য জয়পুরের একটি প্রাসাদ ১৭ কোটি রুপিতে বুক করা হয়েছিল।

বাগদানের এক মাস পর সিয়া ইনস্টাগ্রামে মোমবাতি জ্বালানো কেকের ছবি পোস্ট করে লিখেন, আমার হৃদয় তার ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার এক মাস পূর্তি উদযাপন। পোস্টটিতে কেতনকে ট্যাগও করেন তিনি।

মে মাসে আরেকটি পোস্টে দেখা যায়, কেতন সিয়াকে ফুল দিচ্ছেন। ক্যাপশনে সিয়া লিখেন, ‘পছন্দ করি তোমাকে’ কথাটা সে খুব সিরিয়াসলি নিয়েছে। আরেক পোস্টে কেতনের শেয়ার করা একটি ছবি পুনরায় পোস্ট করে সিয়া লিখেন, ওই হাসিটা, সঙ্গে ছিল হৃদয়ের ইমোজি।

এরপর ১৯ মে নিজের জন্মদিন উপলক্ষে কাউন্টডাউন স্টোরি পোস্ট করেন সিয়া। সেখানে দেখা যায়, দু’জন রোমান্টিক গানের তালে নাচছেন। কিন্তু মাত্র এক মাস পর, সিয়ার জন্মদিনের আগের দিনই সেই প্রেমের গল্প রক্তাক্ত পরিণতি পায়।

১৮ জুন পুনের কাছে লোহাগড় দুর্গ এলাকায় খাদে পড়ে কেতনের মৃত্যু হয়। শুরুতে ধারণা করা হয়, প্রবল বাতাসে ছবি তুলতে গিয়ে তিনি দুর্ঘটনাবশত পড়ে গেছেন। সিয়া পুলিশকে জানান, কেতন পা পিছলে নিচে পড়ে যান। সেই বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে একটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত হয়।

তবে তদন্তকারীদের সন্দেহ হয়, কারণ কেতনের মৃত্যুর পরও সিয়ার আচরণে কোনো শোক বা ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। তদন্তে জানা যায়, ২২ বছর বয়সী চেতন বাবুলাল চৌধুরীর সঙ্গে সিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত বছর একটি ব্যবসায়িক বৈঠকে তাদের পরিচয় হয়।

সিয়া একটি বেকারির মালিক, আর চেতন শুকনো ফলের ব্যবসা করেন। পুলিশের ভাষ্য, চেতন কেতনকে তাদের সম্পর্কের পথে বাধা হিসেবে দেখতেন। অন্যদিকে সিয়াও কেতনকে বিয়ে করতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং চেতনের সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যেতে চাইছিলেন।

পুলিশ জানায়, সিয়া কেতনকে বিয়ে করতে চাননি। তিনি মনে করতেন, চেতনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেতন একটি বাধা।

পুলিশের দাবি, বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে সিয়া কেতনকে লোহাগড় দুর্গে নিয়ে যান। পরে চেতন সেখানে পৌঁছান এবং প্রায় ২০ থেকে ৩০ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে তাদের অনুসরণ করেন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, পরিচয় গোপন করতে চেতন একটি হুডি পরে দুর্গের পথ ধরে কেতন ও সিয়ার পিছু নিচ্ছেন। তদন্তকারীদের অভিযোগ, সুযোগ বুঝে সিয়া ও চেতন কেতনকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে গভীর খাদে ফেলে দেন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

তদন্তে আরও জানা গেছে, গত সাত মাসে সিয়া ও চেতন মোট ২ হাজার ৪টি ফোনকল করেছেন। এসব কথোপকথনের মোট সময় ছিল প্রায় ২৩৮ ঘণ্টা।

তাদের সম্পর্ক শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে। তখনই কেতন ও সিয়ার পরিবারের সদস্যরা বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন।

কেতনের বাবা বিশাল আগারওয়াল দাবি করেছেন, জুনের শুরুতে বালিতে প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের জন্য যাওয়ার কথা ছিল কেতন ও সিয়ার। গত
৬ জুন মুম্বাই বিমানবন্দরে পৌঁছে কেতন দেখতে পান, তার পাসপোর্ট নেই। অথচ পরিবারের অন্য সদস্যদের সব নথিপত্র ঠিকঠাক ছিল।

কেতনের বাবার অভিযোগ, পথে একটি খাবারের দোকানে থামার সময় সিয়া মোবাইল ফোন গাড়িতে ফেলে আসার কথা বলে একা গাড়িতে ফিরে যান। পরে বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, শুধু কেতনের পাসপোর্টটিই নিখোঁজ।

এর ফলে কেতন ভ্রমণে যেতে পারেননি এবং বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হন। পুলিশের দাবি, ১৪ জুন লোহাগড় দুর্গে সিয়া প্রথমবার কেতনকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। সেদিন তিনি কেতনকে ধাক্কা দিলেও কেতন পাশের একটি ঝোপ আঁকড়ে ধরে প্রাণে বেঁচে যান।

পরে ঘটনাটি আড়াল করতে সিয়া সাপ দেখার ভান করে চিৎকার করেন এবং কেতনকে জড়িয়ে ধরেন। অবশেষে ১৮ জুন দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় কেতনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ পুলিশের।

তদন্তে আরও জানা গেছে, আগের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হবে, সে জন্য অভিযুক্তরা একটি ‘প্ল্যান সি’ বা বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত রেখেছিল।

রাজকীয় বিয়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার
পরিবারের ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয় বলেন, দুই পরিবারই বিয়ে নিয়ে অত্যন্ত আনন্দিত ছিল। জয়পুরের প্রাসাদ বুকিং থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত বিমানের ব্যবস্থা- সব প্রস্তুতি এগিয়ে চলছিল। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উভয় পরিবারকেই গভীরভাবে স্তম্ভিত করেছে।

পুলিশ সিয়া গোয়াল ও চেতন বাবুলাল চৌধুরীর বিরুদ্ধে হত্যা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মামলা দায়ের করেছে।

Tag :
এখন আলোচনায়

লালমনিরহাটে বাসের ধাক্কায় অটোরিকশা চালক নিহত; স্বজন ও এলাকাবাসীর বিক্ষোভে মহাসড়ক অবরোধ

ইনস্টাগ্রামে স্বপ্নের প্রেম, ‍বিয়ে এড়াতে হবু স্বামীকে পাহাড় থেকে ফেলে হত্যা

আপডেট সময় : ০১:১২:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সম্পর্ক ছিল নিখুঁত প্রেমের গল্পের মতো। বাগদান, ফুলের তোড়া, আলিঙ্গন, নাচ, ভালোবাসার বার্তা- সব মিলিয়ে যেন রূপকথার সম্পর্ক। কিন্তু সেই সম্পর্কের অন্তরালে তৈরি হচ্ছিল এক ভয়াবহ হত্যার ষড়যন্ত্র।

ভারতের মহারাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান কেতন বিশাল আগারওয়ালের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাগদত্তা সিয়া গোয়াল এবং তার কথিত প্রেমিক চেতন বাবুলাল চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সিয়া ও কেতন তাদের বাগদানের ঘোষণা দেন। আগামী নভেম্বর মাসে রাজকীয় আয়োজনে তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। অতিথিদের পরিবহনের জন্য দুটি প্রাইভেট বিমান ভাড়া করা হয়েছিল এবং বিয়ের জন্য জয়পুরের একটি প্রাসাদ ১৭ কোটি রুপিতে বুক করা হয়েছিল।

বাগদানের এক মাস পর সিয়া ইনস্টাগ্রামে মোমবাতি জ্বালানো কেকের ছবি পোস্ট করে লিখেন, আমার হৃদয় তার ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার এক মাস পূর্তি উদযাপন। পোস্টটিতে কেতনকে ট্যাগও করেন তিনি।

মে মাসে আরেকটি পোস্টে দেখা যায়, কেতন সিয়াকে ফুল দিচ্ছেন। ক্যাপশনে সিয়া লিখেন, ‘পছন্দ করি তোমাকে’ কথাটা সে খুব সিরিয়াসলি নিয়েছে। আরেক পোস্টে কেতনের শেয়ার করা একটি ছবি পুনরায় পোস্ট করে সিয়া লিখেন, ওই হাসিটা, সঙ্গে ছিল হৃদয়ের ইমোজি।

এরপর ১৯ মে নিজের জন্মদিন উপলক্ষে কাউন্টডাউন স্টোরি পোস্ট করেন সিয়া। সেখানে দেখা যায়, দু’জন রোমান্টিক গানের তালে নাচছেন। কিন্তু মাত্র এক মাস পর, সিয়ার জন্মদিনের আগের দিনই সেই প্রেমের গল্প রক্তাক্ত পরিণতি পায়।

১৮ জুন পুনের কাছে লোহাগড় দুর্গ এলাকায় খাদে পড়ে কেতনের মৃত্যু হয়। শুরুতে ধারণা করা হয়, প্রবল বাতাসে ছবি তুলতে গিয়ে তিনি দুর্ঘটনাবশত পড়ে গেছেন। সিয়া পুলিশকে জানান, কেতন পা পিছলে নিচে পড়ে যান। সেই বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে একটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত হয়।

তবে তদন্তকারীদের সন্দেহ হয়, কারণ কেতনের মৃত্যুর পরও সিয়ার আচরণে কোনো শোক বা ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। তদন্তে জানা যায়, ২২ বছর বয়সী চেতন বাবুলাল চৌধুরীর সঙ্গে সিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত বছর একটি ব্যবসায়িক বৈঠকে তাদের পরিচয় হয়।

সিয়া একটি বেকারির মালিক, আর চেতন শুকনো ফলের ব্যবসা করেন। পুলিশের ভাষ্য, চেতন কেতনকে তাদের সম্পর্কের পথে বাধা হিসেবে দেখতেন। অন্যদিকে সিয়াও কেতনকে বিয়ে করতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং চেতনের সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যেতে চাইছিলেন।

পুলিশ জানায়, সিয়া কেতনকে বিয়ে করতে চাননি। তিনি মনে করতেন, চেতনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেতন একটি বাধা।

পুলিশের দাবি, বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে সিয়া কেতনকে লোহাগড় দুর্গে নিয়ে যান। পরে চেতন সেখানে পৌঁছান এবং প্রায় ২০ থেকে ৩০ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে তাদের অনুসরণ করেন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, পরিচয় গোপন করতে চেতন একটি হুডি পরে দুর্গের পথ ধরে কেতন ও সিয়ার পিছু নিচ্ছেন। তদন্তকারীদের অভিযোগ, সুযোগ বুঝে সিয়া ও চেতন কেতনকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে গভীর খাদে ফেলে দেন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

তদন্তে আরও জানা গেছে, গত সাত মাসে সিয়া ও চেতন মোট ২ হাজার ৪টি ফোনকল করেছেন। এসব কথোপকথনের মোট সময় ছিল প্রায় ২৩৮ ঘণ্টা।

তাদের সম্পর্ক শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে। তখনই কেতন ও সিয়ার পরিবারের সদস্যরা বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন।

কেতনের বাবা বিশাল আগারওয়াল দাবি করেছেন, জুনের শুরুতে বালিতে প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের জন্য যাওয়ার কথা ছিল কেতন ও সিয়ার। গত
৬ জুন মুম্বাই বিমানবন্দরে পৌঁছে কেতন দেখতে পান, তার পাসপোর্ট নেই। অথচ পরিবারের অন্য সদস্যদের সব নথিপত্র ঠিকঠাক ছিল।

কেতনের বাবার অভিযোগ, পথে একটি খাবারের দোকানে থামার সময় সিয়া মোবাইল ফোন গাড়িতে ফেলে আসার কথা বলে একা গাড়িতে ফিরে যান। পরে বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, শুধু কেতনের পাসপোর্টটিই নিখোঁজ।

এর ফলে কেতন ভ্রমণে যেতে পারেননি এবং বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হন। পুলিশের দাবি, ১৪ জুন লোহাগড় দুর্গে সিয়া প্রথমবার কেতনকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। সেদিন তিনি কেতনকে ধাক্কা দিলেও কেতন পাশের একটি ঝোপ আঁকড়ে ধরে প্রাণে বেঁচে যান।

পরে ঘটনাটি আড়াল করতে সিয়া সাপ দেখার ভান করে চিৎকার করেন এবং কেতনকে জড়িয়ে ধরেন। অবশেষে ১৮ জুন দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় কেতনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ পুলিশের।

তদন্তে আরও জানা গেছে, আগের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হবে, সে জন্য অভিযুক্তরা একটি ‘প্ল্যান সি’ বা বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত রেখেছিল।

রাজকীয় বিয়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার
পরিবারের ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয় বলেন, দুই পরিবারই বিয়ে নিয়ে অত্যন্ত আনন্দিত ছিল। জয়পুরের প্রাসাদ বুকিং থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত বিমানের ব্যবস্থা- সব প্রস্তুতি এগিয়ে চলছিল। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উভয় পরিবারকেই গভীরভাবে স্তম্ভিত করেছে।

পুলিশ সিয়া গোয়াল ও চেতন বাবুলাল চৌধুরীর বিরুদ্ধে হত্যা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মামলা দায়ের করেছে।