
কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:
মহাকাশে মানুষের বসতি স্থাপন এখন আর কেবল সায়েন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর পাতায় সীমাবদ্ধ নেই। বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা এবং প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের এই স্বপ্নকে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে আসছে।
পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই বিকল্প আবাসের কথা ভাবছেন। বর্তমানে নাসা (NASA), স্পেস-এক্স (SpaceX) এবং ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি সংস্থাগুলো এই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
তবে বসে নেই আমাদের দেশেরও ক্ষুদে গবেষকরা। ইতিমধ্যে নিজের চিন্তা থেকে এ বিষয়ে গবেষণা করে ঝিনাইদহের ৫জন কৃতি সন্তান একটি আর্টিকেল লিখে সংস্থাটিতে পাঠিয়েছিলেন। এতে প্রথম স্থান অধিকার করায় তারা ডাক পেয়েছেন সংস্থাটিতে। জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার এই পাঁচ কৃতিসন্তানের মধ্যে রয়েছেন, খুলনা বিভাগীয় প্রেস ক্লাব কোটচাঁদপুর উপজেলা শাখার সভাপতি কামরুজ্জামান সিদ্দিকের গর্বিত সন্তানও। আছে পার্শ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার আরো দুই কৃতিসন্তান। এরা সবাই একই স্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছেন।
আজ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ঝিনাইদহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করতে এসেছিলেন এই সাত ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা। সাথে ছিলেন গর্বিত বাবারাও।
খুলনা বিভাগীয় প্রেসক্লাবের সাথে যুক্ত থাকায় পাসপোর্ট অফিসে এসে স্মরণ করেছিলেন সহকর্মী কামরুজ্জামান সিদ্দিক ভাই। যে কারণে আমাদের জেলার ৫জন ও পার্শ্ববর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার ২জন কৃতিসন্তানদের অনুভূতি ও গবেষণা সম্পর্কে একটি ইন্টারভিউ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার।
ইন্টারভিউ শেষে অবাক চিত্তে ভাবনায় ফেলে দিল আমাকে। এই বয়সে কোন বিজ্ঞানাগারের সহযোগিতা ছাড়াই আমাদের জেলার সূর্য সন্তানেরা মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করতে পারে এটা অবাক করার বিষয়! কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই বয়সীদের নিয়ে এমন গর্ব করার মতো নিউজ আমরা খুব কমই দেখতে পাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর খবরের পাতার হেডলাইন গুলো কিশোর গ্যাংরা দখল করায় এদের স্থান খুব নগণ্য।
মাদকাসক্ত আর বিকৃত মানসিকতা নিয়ে কিশোর গ্যাং সেজে সমাজে আপনি ও আপনার পরিবার কতটা সম্মানিত তা আমার অজানা। তবে আপনার-ই বয়সি এই সাতজন আজ শুধু সমাজের নয়, পুরো দেশের কৃতি সন্তান হিসেবে সম্মান অর্জন করতে চলেছে। বয়স কিন্তু একই শুধু ভাবনার জায়গাটা আলাদা।
তাই আসুন দৃষ্টি ভঙ্গি পরিবর্তন করে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ ও মা-বোনদের সম্ভ্রম বিসর্জনের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই সোনার বাংলাদেশে সোনার মানুষ হয়ে গড়ে উঠি। সমস্ত কু চিন্তা ঝেড়ে ভাবনায় নিয়ে আসি প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা। গড়ে তুলি সমৃদ্ধির নতুন বাংলাদেশ। আর এর শুরুটা হোক প্রাথমিক লেবেল থেকে একাডেমীক শিক্ষায় আরেকটি অধ্যায় যুক্ত করে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির ভাবনায় ব্যাস্ত করতে।
জানা গেছে, বর্তমানে মহাকাশে বসবাসের গবেষণায় দুটি জায়গা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। চাঁদ পৃথিবীর নিকটতম হওয়ায় এখানে বসতি স্থাপন সবচেয়ে সহজ। নাসার “আর্টেমিস” (Artemis) মিশনের লক্ষ্য হলো চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করা, যা ভবিষ্যতের দীর্ঘস্থায়ী মহাকাশ মিশনের জন্য “বেস ক্যাম্প” হিসেবে কাজ করবে।
মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল ও দিন-রাত্রির চক্র পৃথিবীর সাথে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ। এলন মাস্কের স্পেস-এক্স ২০৫০ সালের মধ্যে মঙ্গলে ১০ লক্ষ মানুষের শহর গড়ার গভীর পরিকল্পনা করছে বিজ্ঞানীরা। তবে তাদের মতে মহাকাশে টিকে থাকা কেবল সাহসের বিষয় নয়, এটি চরম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করা।
এই সাত ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকে যা যানা গেলো তা হলো, মহাকাশে শ্বাসযোগ্য অক্সিজেন নেই। “MOXIE” নামক যন্ত্রের মাধ্যমে মঙ্গলের কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে অক্সিজেন তৈরির পরীক্ষা সফলভাবে চালিয়েছেন বিজ্ঞানিরা।
পৃথিবী আমাদের বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বক ক্ষেত্রের মাধ্যমে মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। মহাকাশে বসবাসের জন্য এমন ঘর প্রয়োজন যা উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন আটকাতে সক্ষম। এক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ ঘর বা চাঁদের মাটির রেগোলিথ দিয়ে তৈরি ইটের ব্যবহার নিয়েও গবেষণা চলছে।
দীর্ঘ সময় ওজনহীনতায় থাকলে মানুষের হাড় ও পেশি দুর্বল হয়ে যায়। তাই বিজ্ঞানীরা ঘূর্ণায়মান স্পেস স্টেশনের পরিকল্পনা করছেন যা সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্সের মাধ্যমে কৃত্রিম মহাকর্ষ তৈরি করবে।
পৃথিবী থেকে খাবার নিয়ে গিয়ে বেশিদিন চলা অসম্ভব। তাই গবেষণার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে স্পেস ফার্মিং। যেখানে মাটি ছাড়াই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কিভাবে পানির মাধ্যমে চাষাবাদ করা যায় গবেষণায় রয়েছে এ চিন্তাও।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) বর্তমানে প্রস্রাব এবং ঘাম বিশুদ্ধ করে পানযোগ্য পানি তৈরি করা হয়, যা মহাকাশ বসতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বদ্ধ পরিবেশে এবং পৃথিবী থেকে কোটি মাইল দূরে থাকার ফলে মানুষের মনের ওপর কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়েও চলছে গবেষণা।
মহাকাশে বসবাস প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এটি মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক নতুন সম্ভাবনা। ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে মঙ্গলে মানুষের পদচিহ্ন স্থায়ী করার যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, তা সফল হলে মানুষ হবে একটি “মাল্টি-প্ল্যানেটারি” প্রজাতি।
গবেষকরা বলেন, পৃথিবী হলো মানবজাতির দোলনা, তাই কেউ চিরকাল দোলনায় থাকতে পারে না। যে কারণে বিকল্প পথ হিসেবে তাদের ভাবনায় এনে দিয়েছে এই গবেষণা।
পরিশেষে তাদের এই গবেষণা সফল করতে দেশের মানুষের দোয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা একান্ত কাম্য বলে জানান এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















