স্টাফ রিপোর্টার, চুয়াডাঙ্গা :
দেশের ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান চুয়াডাঙ্গার দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের নাম। একদিকে মূল চিনি ইউনিটে লোকসানের গভীর ক্ষত, অন্যদিকে ডিস্টিলারি বা মদ ইউনিটে উপচে পড়া মুনাফা।
এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে ইতিহাস গড়লেও, চিনি শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
চলতি ২০২৫-২০২৬ মাড়াই মৌসুমেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি কেরুর চিনি ইউনিট। গত ৫ ডিসেম্বর জমকালো উদ্বোধনের মাধ্যমে ৬৮ কার্যদিবসের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাড়াই শুরু হলেও, আখের অভাবে মাত্র ৬২ দিনেই (৬ ফেব্রুয়ারি) কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হয়েছে।
চলতি মৌসুমে ৭৬ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৪ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয়নি।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও চিনি খাতে প্রায় ৬২ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে প্রতিষ্ঠানটি।
চিনি ইউনিটের এই ধারাবাহিক লোকসান ঢেকে দিচ্ছে ডিস্টিলারি ইউনিটের আকাশচুম্বী আয়। ফরেন লিকার, কান্ট্রি স্পিরিট, ভিনেগার ও জৈব সারের চাহিদা বাজারে তুঙ্গে থাকায় এই ইউনিটটি এখন প্রতিষ্ঠানের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
"চিনি ইউনিটের লোকসান সমন্বয় করেও গত অর্থবছরে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ১২৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা প্রতিষ্ঠানের ৮৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড।" — ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ
কেন ধুঁকছে চিনি শিল্প?
প্রতিবেদনে চিনি শিল্পের এই বিপর্যয়ের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে:
কৃষকদের অনাগ্রহ: স্থানীয় চাষিদের অভিযোগ, আখের উৎপাদন খরচের তুলনায় সরকারি নির্ধারিত মূল্য অত্যন্ত নগণ্য। আখের বদলে অন্য ফসল চাষে কৃষকরা বেশি লাভবান হচ্ছেন।
প্রযুক্তির অভাব: ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ও পুরনো প্রযুক্তি চিনি আহরণের হার (Recovery Rate) কমিয়ে দিচ্ছে।
বাজার সিন্ডিকেট ও আমদানি: দেশীয় চিনির উৎপাদন কম হওয়ায় আমদানিকৃত চিনির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আমদানিকারক সিন্ডিকেটের প্রভাবে দেশীয় শিল্প বাজারে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।
সচেতন মহল ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ডিস্টিলারির মুনাফা দিয়ে একটি চিনিকলকে বেশিদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। চিনি ইউনিটকে লাভজনক করতে হলে-
আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে চাষিদের উৎসাহিত করা।কারখানায় আধুনিক ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি সংযোজন। বাজার ব্যবস্থাপনায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিন্ডিকেট দূর করা।
ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানি কেবল মদ বিক্রির প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং চিনি উৎপাদনেও তার হারানো গৌরব ফিরে পাক—এমনটাই প্রত্যাশা চুয়াডাঙ্গাবাসীর।
তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আধুনিকায়ন ছাড়া চিনি ইউনিটের এই 'ডেডলক' ভাঙা অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।