
ফসলের ক্ষেতে পাখি ও বন্যপ্রাণীর আক্রমণ ঠেকাতে গ্রামবাংলার মাঠে একসময় সবচেয়ে পরিচিত ছিল কাকতাড়ুয়া। মানুষ আকৃতির এই কৃত্রিম প্রতিরূপ ৯০–এর দশক পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলের ফসলি মাঠে এই পদ্ধতির ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো।
মানুষের শরীরের আকৃতি দিয়ে তৈরি করা এই কাকতাড়ুয়াগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো মানুষ দাঁড়িয়ে ফসল পাহারা দিচ্ছে। এর ফলে পশু-পাখির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা পায় এবং কৃষক লাভবান হন। আধুনিক কৃষির যুগে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার সত্ত্বেও, চুয়াডাঙ্গা জেলার কিছু কৃষক এখনো সনাতন এই কাকতাড়ুয়া পদ্ধতি ব্যবহার করে ফসলের সুরক্ষা নিশ্চিত করছেন।
কাকতাড়ুয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীকে ভয় দেখিয়ে ফসলি জমি থেকে দূরে রাখা। এটি এমন এক পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি, যেখানে পাখি মারা যায় না, বরং ফসলের সুরক্ষা নিশ্চিত হয় এবং পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা পায়।
সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা ও জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন মাঠে দেখা যায়, অনেক কৃষকই জমিতে এখনও কাকতাড়ুয়া দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। দূর থেকে এগুলোকে দেখে অনায়াসেই মনে হয়, যেন কোনো মানুষ ফসল পাহারা দিচ্ছে। বাতাসের দোলায় নড়াচড়া করায় পাখি, শিয়াল, খরগোশসহ ছোট-বড় প্রাণী ক্ষেতে আসতে ভয় পায়।
সাধারণত বাঁশ, খড়, পুরাতন জামা-কাপড়, এবং মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করা হয়। এটি দেখতে অনেকটা দু-হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মতো। মাথার আকৃতি দিতে কেউ খড় ব্যবহার করেন, আবার কেউবা মাটির হাঁড়ি বসিয়ে দেন। হাঁড়িতে সাদা রঙ বা কয়লা দিয়ে চোখ-মুখের ছবি আঁকা হয়, যা দেখতে কিছুটা মানুষের প্রতিকৃতির মতো হয়।
শরীর ঢাকতে পুরনো শার্ট, গেঞ্জি বা পাঞ্জাবি পরানো হয়। ফসলের জমিতে পুঁতে রাখা হয়, যাতে দূর থেকে দেখলে অবিকল মানুষের মতো মনে হয়।
বাতাসে হালকা দোল খাওয়ার কারণে কাক, শালিক, চড়ুই, ঘুঘুসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি একে মানুষ ভেবে ভয় পায় এবং ক্ষেতে আসতে সাহস পায় না। পশু প্রাণীরাও বিভ্রান্ত হয়ে জমি থেকে দূরে থাকে।
সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন ফসলি মাঠ ঘুরে দেখা যায়, এখনো অনেক কৃষক তাদের জমিতে এই আদিকালের ফসল সুরক্ষা পদ্ধতির কাকতাড়ুয়া দাঁড় করিয়ে রেখেছেন।
খুব ভালোভাবে খেয়াল না করলে পথচারী বা পাখি—যে কেউই একে মানুষ ভেবে ভুল করতে পারে।
উপজেলার রুদ্রনগর গ্রামের কৃষক মো. রাজ্জাক হোসেন জানান, “বীজ বোনা বা চারা লাগানোর পরে পাখিদের আনাগোনা অনেক বেড়ে যায়। সারাক্ষণ পাহারা দিয়েও তাদের ফেরানো যায় না। তাই ক্ষেতে কাকতাড়ুয়া দিয়েছি।”
কুড়ুলগাছি ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের কৃষক মো. শ্যামল মিয়া বলেন, “আমরা কৃষক মানুষ, অনেক জমি চাষ করা লাগে। সব সময় তো আর পাখি তাড়াতে পারি না। তাই বাঁশ, খড়, পুরাতন কাপড় আর মাটির হাঁড়ি দিয়া কাকতাড়ুয়া বানায়ে ক্ষেতে খাড়া করে রাখি। এতে পশু-পাখি কম আসে।”
পরানপুর গ্রামের কৃষক মো. শামসুল হক কাকতাড়ুয়ার উপকারিতা উল্লেখ করে বলেন, “কাকতাড়ুয়ার কারণে ক্ষেতে পাখি কম আসে। ফসলও নষ্ট হয় না। কাকতাড়ুয়া আমাদের বন্ধুর মতো করে সাহায্য করে। কাকতাড়ুয়া না দিলে মাঠে পাখি বসে সকাল-বিকেল, এতে ফসলের অনেক ক্ষতি হয়।”
স্বাধীনতা পরবর্তী ৯০-এর দশক পর্যন্ত কাকতাড়ুয়ার ব্যবহার গ্রাম অঞ্চলে খুব পরিচিত ছিল। কৃষি বিভাগের নতুন নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে পরবর্তী সময়ে এই পদ্ধতির ব্যবহার কমতে শুরু করে।
তবে কিছু সংখ্যক কৃষক এখনো বিশ্বাস করেন যে কাকতাড়ুয়া ব্যবহারে ফসলের জমিতে ফসল ভালো হয়। তাদের বিশ্বাস, এটি ব্যবহারে কারো নজর লাগে না এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ফসল ভালো থাকে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার কাকতাড়ুয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “কাকতাড়ুয়া ব্যবহার করে ফসলের জমিতে ইঁদুর দমনে ভালো ফল পাওয়া যায়। এছাড়াও নিশাচর প্রাণীরা জমিতে বিচরণ করার সময় ভয় পায় এবং ফসলেরও সুরক্ষা হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “পাখি হত্যা এক ধরনের অপরাধ। তাই কাকতাড়ুয়ার ফলে কৃষক লাভবান হচ্ছেন, আবার পাখিও রক্ষা পাচ্ছেন। পাখি তাড়ানোর জন্য আদিকাল থেকে গ্রামের কৃষকরা ক্ষেতে কাকতাড়ুয়া ব্যবহার করে আসছেন এবং এটি মাঠের ফসল রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর।”
সনাতন এই কাকতাড়ুয়া পদ্ধতি আধুনিক কৃষির যুগেও তার উপযোগিতা ধরে রেখেছে, যা ফসল সুরক্ষায় কৃষককে কম খরচে এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে কার্যকর সমাধান দিচ্ছে।
নাঈম উদ্দীন 

























