০১:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস

  • অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:২২:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অগাস্ট ২০২৪
  • ৭৫ Time View

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারের বাকি সদস্যদের নাম চূড়ান্ত হবে ॥ এতো ত্যাগ স্বীকার করা শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব ফেরাতে পারি না: ড. ইউনূস


ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ৩৩ ঘণ্টার মধ্যেই শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব জয়নাল আবেদীন গতকাল রাত ১২টার কিছু আগে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, বঙ্গভবনে আজ (মঙ্গলবার) রাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কসহ সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের বাকি সদস্যদের নাম চূড়ান্ত হবে। এর আগে, কে হচ্ছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান আর তার সঙ্গেই বা থাকছেন কারা এ নিয়ে সোমবার থেকেই নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। দেশে কার্যত কোনো সরকার নেই, নেই আইনশৃঙ্খলাও। ফলে দেশ চরম এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করে দেশে শৃঙ্খলা ফেরানোই এখন সংশ্লিষ্টদের প্রধান কর্তব্য বলে মনে করছেন সবাই। এর মধ্যে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নাম প্রস্তাব করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেই প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন শান্তিতে নোবেলবিজয়ী ড. ইউনূস।

এ বিষয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘যে শিক্ষার্থীরা এত ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তারা যখন এই কঠিন সময়ে আমাকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করেন, তাহলে আমি কীভাবে তা প্রত্যাখ্যান করি?’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছেড়েছেন শেখ হাসিনা। এরপর দেশ পরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে সোমবার বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধানদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। পরে বঙ্গভবন থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে অনতিবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। গতকাল মঙ্গলবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

বঙ্গভবনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। নির্বাহী আদেশে এই সংসদ বিলুপ্ত করা হলো। এর আগে বেলা তিনটার মধ্যে সংসদ ভেঙে দেওয়ার আলটিমেটাম দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং বিভিন্ন মামলায় আটকদের মুক্তি দেওয়া শুরু হয়েছে এবং ইতোমধ্যে অনেকে মুক্তি পেয়েছেন।

এদিকে, বর্তমান পরিস্থিতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা ঠিক করতে মঙ্গলবার বৈঠকে বসেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, তিন বাহি- নীর প্রধান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।

এর আগে সন্ধ্যা ৬টা ৭ মিনিটে সেনাবাহিনীর একটি কোস্টার বাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৩ জন সমন্বয়কসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল এবং অধ্যাপক তানজীমউদ্দীন বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। এর ঠিক এক ঘণ্টা ৩৩ মিনিটে পরে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানরা একটি গাড়ি বহর নিয়ে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। বহরে ১০টির বেশি গাড়ি ছিল। এরপরই শুরু হয় বর্তমান পরিস্থিতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে বৈঠক।

বঙ্গভবনে প্রবেশের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে আলোচনার জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ১৩ সদস্যের একটি টিম বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি ও তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল এবং অধ্যাপক তানজীমউদ্দীন রয়েছেন। আলোচনা শেষে আমরা বিস্তারিত জানাবো। এর আগে গতকাল ভোর ৪টার দিকে ফেসবুকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের রূপরেখা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেখানে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করা হয়।

ভিডিও বার্তায় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের রূপরেখা দিতে আমরা ২৪ ঘণ্টা সময় নিয়েছিলাম। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় এখনই রূপরেখা ঘোষণা করছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের অন্তর্র্বতীকালীন সরকার গঠন করা হবে। তার সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে, তিনি দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়েছেন।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমানে ফ্রান্সের প্যারিসে আছেন। তিনি শিগগিরই ঢাকা ফিরবেন বলে ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ জানিয়েছেন।

এদিকে, অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনুসের নাম ঘোষণার পর তার সরকারে কে কে থাকছেন তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। গতকাল রাত পর্যন্ত বিভিন্ন মহলে যেসব নাম আলোচনায় ছিলো তারা হলেন, শিক্ষাবিদ ড. সলিমুল্লাহ খান, ড. আসিফ নজরুল, বিচারপতি (অব.) মো. আব্দুল ওয়াহাব মিয়া, জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া, মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, হোসেন জিল্লুর রহমান, বিচারপতি (অব.) এমএ মতিন প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্ম ১৯৪০ সালের ২৮ জুন। একজন সামাজিক উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ এবং সুশীল সমাজের নেতা হিসেবে তিনি সমাদৃত। ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষুদ্রঋণ ও ক্ষুদ্রবিত্ত ধারণার প্রবর্তনের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ২০১২ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হন এবং এই পদে তিনি ২০১৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি তার অর্থনৈতিক কাজের উপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি বই প্রকাশ করেছেন। ড. ইউনূস চট্টগ্রামের হাটহাজারির কাপ্তাই সড়কের বাথুয়া গ্রামে একটি বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তার পিতা হাজী দুলা মিয়া সওদাগর ছিলেন একজন জহুরি, এবং তার মাতা সুফিয়া খাতুন। তার শৈশব কাটে গ্রামে। ১৯৪৪ সালে তার পরিবার চট্টগ্রাম শহরে চলে আসে এবং তিনি তার গ্রামের স্কুল থেকে লামাবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পূর্ব পাকিস্তানের ৩৯ হাজার ছাত্রের মধ্যে ১৬তম স্থান অধিকার করেন। বিদ্যালয় জীবনে তিনি একজন সক্রিয় বয় স্কাউট ছিলেন এবং ১৯৫২ সালে পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারত এবং ১৯৫৫ সালে কানাডায় জাম্বোরিতে অংশগ্রহণ করেন। পরে, যখন ইউনুস চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা করছিলেন, তখন তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন এবং নাটকের জন্য পুরস্কার জিতেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৬০ সালে বিএ এবং ১৯৬১ সালে এমএ সম্পন্ন করেন। এছাড়াও তিনি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা এবং আজাদী পত্রিকায় কলাম লেখার কাজে যুক্ত ছিলেন।

Tag :
এখন আলোচনায়

রঘুনাথপুরে জামায়াতে ইসলামীর পথসভা: জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস

আপডেট সময় : ০২:২২:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অগাস্ট ২০২৪

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারের বাকি সদস্যদের নাম চূড়ান্ত হবে ॥ এতো ত্যাগ স্বীকার করা শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব ফেরাতে পারি না: ড. ইউনূস


ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ৩৩ ঘণ্টার মধ্যেই শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব জয়নাল আবেদীন গতকাল রাত ১২টার কিছু আগে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, বঙ্গভবনে আজ (মঙ্গলবার) রাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কসহ সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের বাকি সদস্যদের নাম চূড়ান্ত হবে। এর আগে, কে হচ্ছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান আর তার সঙ্গেই বা থাকছেন কারা এ নিয়ে সোমবার থেকেই নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। দেশে কার্যত কোনো সরকার নেই, নেই আইনশৃঙ্খলাও। ফলে দেশ চরম এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করে দেশে শৃঙ্খলা ফেরানোই এখন সংশ্লিষ্টদের প্রধান কর্তব্য বলে মনে করছেন সবাই। এর মধ্যে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নাম প্রস্তাব করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেই প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন শান্তিতে নোবেলবিজয়ী ড. ইউনূস।

এ বিষয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘যে শিক্ষার্থীরা এত ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তারা যখন এই কঠিন সময়ে আমাকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করেন, তাহলে আমি কীভাবে তা প্রত্যাখ্যান করি?’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছেড়েছেন শেখ হাসিনা। এরপর দেশ পরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে সোমবার বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধানদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। পরে বঙ্গভবন থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে অনতিবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। গতকাল মঙ্গলবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

বঙ্গভবনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। নির্বাহী আদেশে এই সংসদ বিলুপ্ত করা হলো। এর আগে বেলা তিনটার মধ্যে সংসদ ভেঙে দেওয়ার আলটিমেটাম দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং বিভিন্ন মামলায় আটকদের মুক্তি দেওয়া শুরু হয়েছে এবং ইতোমধ্যে অনেকে মুক্তি পেয়েছেন।

এদিকে, বর্তমান পরিস্থিতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা ঠিক করতে মঙ্গলবার বৈঠকে বসেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, তিন বাহি- নীর প্রধান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।

এর আগে সন্ধ্যা ৬টা ৭ মিনিটে সেনাবাহিনীর একটি কোস্টার বাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৩ জন সমন্বয়কসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল এবং অধ্যাপক তানজীমউদ্দীন বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। এর ঠিক এক ঘণ্টা ৩৩ মিনিটে পরে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানরা একটি গাড়ি বহর নিয়ে বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। বহরে ১০টির বেশি গাড়ি ছিল। এরপরই শুরু হয় বর্তমান পরিস্থিতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে বৈঠক।

বঙ্গভবনে প্রবেশের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে আলোচনার জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ১৩ সদস্যের একটি টিম বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি ও তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল এবং অধ্যাপক তানজীমউদ্দীন রয়েছেন। আলোচনা শেষে আমরা বিস্তারিত জানাবো। এর আগে গতকাল ভোর ৪টার দিকে ফেসবুকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের রূপরেখা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেখানে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করা হয়।

ভিডিও বার্তায় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের রূপরেখা দিতে আমরা ২৪ ঘণ্টা সময় নিয়েছিলাম। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় এখনই রূপরেখা ঘোষণা করছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের অন্তর্র্বতীকালীন সরকার গঠন করা হবে। তার সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে, তিনি দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়েছেন।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস বর্তমানে ফ্রান্সের প্যারিসে আছেন। তিনি শিগগিরই ঢাকা ফিরবেন বলে ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ জানিয়েছেন।

এদিকে, অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনুসের নাম ঘোষণার পর তার সরকারে কে কে থাকছেন তা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। গতকাল রাত পর্যন্ত বিভিন্ন মহলে যেসব নাম আলোচনায় ছিলো তারা হলেন, শিক্ষাবিদ ড. সলিমুল্লাহ খান, ড. আসিফ নজরুল, বিচারপতি (অব.) মো. আব্দুল ওয়াহাব মিয়া, জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া, মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, হোসেন জিল্লুর রহমান, বিচারপতি (অব.) এমএ মতিন প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্ম ১৯৪০ সালের ২৮ জুন। একজন সামাজিক উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ এবং সুশীল সমাজের নেতা হিসেবে তিনি সমাদৃত। ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষুদ্রঋণ ও ক্ষুদ্রবিত্ত ধারণার প্রবর্তনের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ২০১২ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হন এবং এই পদে তিনি ২০১৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি তার অর্থনৈতিক কাজের উপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি বই প্রকাশ করেছেন। ড. ইউনূস চট্টগ্রামের হাটহাজারির কাপ্তাই সড়কের বাথুয়া গ্রামে একটি বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তার পিতা হাজী দুলা মিয়া সওদাগর ছিলেন একজন জহুরি, এবং তার মাতা সুফিয়া খাতুন। তার শৈশব কাটে গ্রামে। ১৯৪৪ সালে তার পরিবার চট্টগ্রাম শহরে চলে আসে এবং তিনি তার গ্রামের স্কুল থেকে লামাবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পূর্ব পাকিস্তানের ৩৯ হাজার ছাত্রের মধ্যে ১৬তম স্থান অধিকার করেন। বিদ্যালয় জীবনে তিনি একজন সক্রিয় বয় স্কাউট ছিলেন এবং ১৯৫২ সালে পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারত এবং ১৯৫৫ সালে কানাডায় জাম্বোরিতে অংশগ্রহণ করেন। পরে, যখন ইউনুস চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা করছিলেন, তখন তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন এবং নাটকের জন্য পুরস্কার জিতেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৬০ সালে বিএ এবং ১৯৬১ সালে এমএ সম্পন্ন করেন। এছাড়াও তিনি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা এবং আজাদী পত্রিকায় কলাম লেখার কাজে যুক্ত ছিলেন।