
পদ্মা সেতু দেশের ভাবমূর্তি ঘুরিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশকে এখন বিশ্ববাসী সমীহ করে চলে, গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিইনি বলে ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারিনি
পশ্চিমাঞ্চল প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘অনেক ঝড়ঝাপটা পার করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে হয়েছে। এটা গর্বের সেতু, টাকার অঙ্কে বিবেচনার জিনিস নয়। এ একটা প্রকল্প দেশের ভাবমূর্তি ঘুরিয়ে দিয়েছে। আগে যারা কথায় কথায় আমাদের ওপর খবরদারি করত; আর ভাবখানা ছিল যে, তারা ছাড়া বাংলাদেশ চলতেই পারবে না। তাদের সে মানসিকতাটা বদলে গেছে। এখন বাংলাদেশ শুনলে সমীহ করে আন্তর্জাতিকভাবে। বিশ্বে এখন আমরা বুক ফুলিয়ে গর্বের সঙ্গে চলছি। আগামী দিনে যত বাধাই আসুক, অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।’শুক্রবার (০৫ জুলাই) বিকালে পদ্মা সেতুর মাওয়াপ্রান্তে আয়োজিত সুুধিসমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। গত ৩০ জুন পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সমাপনী উপলক্ষ্যে এ সুধিসমাবেশের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষ্যে সমাবেশস্থল ও এর আশপাশে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশবাসী পাশে ছিল বলেই জ্ঞানীগুণীদের বাধা সত্ত্বেও সব অতিক্রম করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পেরেছি। সবাই না করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ জটিল স্থাপনা আমরা নির্মাণ করতে পেরেছি। সেতু নির্মাণে জড়িত সব শ্রমিক-কর্মকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই আমি আজ এখানে এসেছি।’ দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সাধারণত কোনো প্রকল্প শেষ হলে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। কিন্তু পদ্মা সেতুর বিষয়টি একেবারেই আলাদা। যারা এ কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ছিলেন, তাদের কৃতজ্ঞতা জানাতেই এই অনুষ্ঠান। দেশের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণের ইতিহাস বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যে জাতি রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করল, সে জাতি কেন মাথা নিচু করে চলবে? অকুতোভয় জাতিকে একেবারেই মর্যাদাহীন করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।’প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতুতে কথিত দুর্নীতির প্রমাণ চেয়েছিলাম আমি। মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে বলেছিলেন তারা। আমি করিনি। পদ্মা সেতু নিজেদের টাকায় করব বলে ঘোষণা দিয়ে তা বাস্তবায়নও করেছি। পদ্মা সেতু হওয়ার সুফল বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পদ্মাপাড়ের মানুষ আমরা সব সময় কষ্ট ভোগ করতাম আসতে-যেতে। প্রথমে ১৯৫২ সালে দাদার সঙ্গে আমরা ঢাকায় যেতে নৌকায় পার হই এ পদ্মা। চার দিন, চার রাত লেগেছিল। তখন আব্বা (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) জেলে। এ যাতায়াতে কত মানুষের জীবন গেছে। বিভিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আজকে আর কোনো সেবাবঞ্চিত হয় না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিইনি বলে ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারিনি। বড় বড় দেশের নারাজিতে যা হয়, তা-ই হয়েছিল আমারও। কেননা দেশের সম্পদ বেচতে রাজি হইনি। আমি জাতির পিতার কন্যা। দেশের সম্পদ বিক্রি করে ক্ষমতায় বসতে পারি না।’প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে বড় দেশ তাকে (ড. ইউনূস) প্রমোট করে, সে দেশের রাষ্ট্রদূত আমার অফিসে আসেন। আমার অফিসারদের ধমকান। বলেন, এই এমডির পদ না থাকলে এই টাকা (পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন) বন্ধ হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘এ এমডি পদের জন্য আমার কাছে তদবির করতে হিলারি ক্লিনটন দুই বার ফোন করলেন। শেরি ব্লেয়ার ফোন করলেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধি এলো। পৃথিবীর অনেকেই এলো। আমি শুধু জিগ্যেস করলাম, এ এমডি পদে কী মধু আছে?’ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা পদ। সেটা হলো একটা ব্যাংকের এমডির পদ। এ পদটা নিয়ে যত জটিলতা, যত সমস্যা। এখন ব্যাংকে যদি আইন থাকে, তার বয়স ৭০ হয়ে গেছে। অতিরিক্ত সময় (এমডি পদে) থেকে ফেলেছেন। তারপরও তিনি সেখানে থাকেন কী করে? এক জন নামিদামি নোবেল বিজয়ী সামান্য একটা এমডি পদের জন্য লালায়িত কেন? এ প্রশ্নের উত্তর কখনো পেলাম না।’ তিনি বলেন, ‘এইচ এম এরশাদ ব্যাংক করলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরকে এনে এমডি হিসেবে বসালেন। সেই প্রফেসর আর ঐ চেয়ার ছাড়তে চান না।আমাদের অর্থমন্ত্রী মুহিত (আবুল মাল আবদুল মুহিত) ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভী ওনার কাছে গিয়ে বললেন, আপনি আর এমডি থাকবেন কেন, আপনি বরং এখানে উপদেষ্টা হিসেবে থাকেন। তাতেও তিনি রাজি না। তিনি মামলা করলেন সরকারের বিরুদ্ধে। দুটি মামলা। সবাই ঘাবড়ে গেল। আমি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বললাম, এটা তো তেমন কিছু না। খালি আইনটা উপস্থাপন করবেন। কোর্ট যদি পারে কারো বয়স বাড়াতে বাড়াক। পরে উনি মামলায় হেরে গিয়ে আরো ক্ষেপে গেলেন। আর তার ঐ রাষ্ট্রদূতের আনাগোনা তো চলছেই। বারবার পিএমওতে (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে) আসেন আর একই কথা শোনান। পরে এক জন আন্ডার সেক্রেটারি এলেন, ঐ একই কথা বললেন। এরপর আমি বললাম, এ বিষয়টি নিয়ে আর কেউ আমেরিকা থেকে এলে আমি দেখা করব না, কথা বলব না। পরে আমি আর কারো সঙ্গে দেখা করিনি।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একই প্রশ্ন। আমি খালি বলেছি, ঐ পদে কী মধু আছে? এখন একটা কথা বলি। এমডি পদে যে কী মধু, এখন যদি দেখেন খোঁজ পাবেন। শ্রমিকরা মামলা করলে, গ্রামীণ ব্যাংকের অডিট রিপোর্ট এলে আরো তথ্য বের হবে।’শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষমতায় যখন ছিলাম না, তখন বিদেশে গেছি, তখন বাংলাদেশের নামটা শুনলে কেউ জিজ্ঞাসা করত, এটা কি ভারতের কোনো অংশ?প্রধানমন্ত্রী বলেন, লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। আর সে স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদা থাকবে না, এটা কি ধরনের বাংলাদেশ? আজ বাংলাদেশের সে অবস্থান নেই। বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ হিসেবে গড়ে তুলব।আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এতে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সেতু বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. মনজুর হোসেন। প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন পদ্মা বহুমুখী সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানের শুরুতেই পদ্মা সেতুর থিম সং প্রচার করা হয়। এছাড়া পদ্মা সেতুর ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। সেতু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা স্মারক প্রদান করা হয়।দুই দিনের সফরে টুঙ্গিপাড়া গেছেন প্রধানমন্ত্রী: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই দিনের সরকারি সফরে টুঙ্গিপাড়ায় গেছেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের সমাপনী উপলক্ষ্যে সুধিসমাবেশে বক্তব্য প্রদান শেষে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে তিনি টুঙ্গিপাড়া পৌঁছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে পুষ্পস্তাবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, দোয়া ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নিজ বাসভবন টুঙ্গিপাড়ায় রাত্রিযাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। আজ শনিবার বেলা ১১টায় বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাজীবন শুরুর সেই গিমাডাঙ্গা-টুঙ্গিপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু কর্নার উদ্বোধন এবং ‘এসো বঙ্গবন্ধুকে জানি’ শীর্ষক অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন করবেন। দুপুর ১২টায় টুঙ্গিপাড়া মালটিপারপাস পৌর সুপার মার্কেট পরিদর্শন করবেন। এরপর নিজ বাসভবনে নামাজ ও মধ্যাহ্ন বিরতির পর বিকাল সাড়ে ৩টায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাতে অংশ নেবেন। বিকাল ৪টায় ঢাকার উদ্দেশে টুঙ্গিপাড়া ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী।
অনলাইন ডেস্ক 



















