শুক্রবার, ৩০ Jul ২০২১, ০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম
খাদ্যশস্য মজুদের রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে সরকার চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে করোনা পরীক্ষায় অতিরিক্ত টাকা আদায় বন্ধ আ’লীগের পদ হারানো ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীর আটক, বিভিন্ন অবৈধ সরঞ্জাম উদ্ধার চুয়াডাঙ্গায় জাতীয় শোক দিবস পালন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা মেহেরপুরের ২ গ্রামে হুট করেই মৃত্যুর হিড়িক, ১ মাসে প্রাণ গেল ৪৪ জনের মাদ্রাসার কমিটি নিয়ে দ্বন্দের জেরে আত্রাইয়ে প্রতিপক্ষের হামালায় মা-ছেলেসহ আহত ৩ আত্রাইয়ে সাপের কামড়ে যুবকের মৃত্যু আত্রাইয়ে লকডাউনে মুরগী খামারীরা চরম লোকসানে শিকার নেক সন্তানের জন্য নিঃসন্তান দম্পতি যে দোয়া পড়বেন যে তিন কাজের জন্য বান্দার জাহান্নাম অবধারিত

কিশোর গ্যাং কালচার অশনিসংকেত

পাড়া-মহল্লা, স্কুল-কলেজ গেট, বিভিন্ন পার্কে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা দেওয়া, মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে তরুণীদের উত্ত্যক্ত করা, মাদকসেবনসহ বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত কিছু কিশোর দেখা যায়, যাদের চাহনিতে আছে রুক্ষতা, নেই নম্রতা-ভদ্রতার ছাপ। এরাই ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত। কিশোর গ্যাং এখন সমাজে ব্যাধির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিশোর অপরাধ আগেও ছিল, বর্তমানেও আছে। তবে দিন যত যাচ্ছে তাদের অপরাধগুলো ক্রমেই হিংস্র, নৃশংস ও বিভীষিকাপূর্ণরূপে দেখা দিচ্ছে। চুরি-ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, খুন, ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা, সংঘবদ্ধভাবে প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যার মতো হিংস্র ধরনের অপরাধ করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলেছে।

কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে ছিন্নমূল পরিবারের সন্তান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া শিক্ষার্থীও রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র বা নারীঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটাচ্ছে হত্যাকা-। জমি দখল, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবে এ আশায় স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা গ্যাং সদস্যদের ব্যবহার করছেন। অভিযোগ রয়েছে, দলীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে এ চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বেগ পেতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বয়সসীমা ১২-১৭ বছরের মধ্যেই বেশি হয়ে থাকে। দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এরা একটি নির্দিষ্ট নাম ও লোগো শরীরে ট্যাটু করে অথবা দেয়ালে লিখে ব্যবহার করে এবং নির্দিষ্ট একটি এলাকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য ছুরি, রামদা, হকিস্টিক, বন্দুক ইত্যাদি সংগ্রহে রাখে। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহচার্য ব্যক্তিত্ব ইত্যাদিও গ্যাং কালচারের জন্য দায়ী। কমিউনিটিতে মানুষের মধ্যে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, ডিভোর্সের কারণে ভেঙে যাওয়া পরিবারে সন্তানরা একাকিত্ব ও হতাশা দূর করার জন্য, নেশাগ্রস্ত পরিবার ইত্যাদিও গ্যাং তৈরির কারণ হতে পারে। স্কুলের পাঠদান প্রক্রিয়া কোনো কারণে ব্যাহত হলে, ক্রমাগত শিক্ষকের বঞ্চনা, খারাপ ফলাফল, বন্ধু-বান্ধব অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকলে, মাদক সেবনের প্রবণতা থাকলে, সহপাঠী দ্বারা বিদ্রƒপের শিকার দুর্বল ছাত্রদের মধ্যে, হিরোইজম দেখানোর প্রবণতা, অনুকরণপ্রবণতা, অল্প বয়সে যৌন আসক্তি ইত্যাদি কারণেও কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠে।

মূলত ২০১৭ সালে ঢাকা উত্তরায় সড়কের ওপর আদনান কবিরকে (১৪) সংঘবদ্ধ গ্যাং মারাত্মকভাবে কুপিয়ে হত্যাকা-ের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতার নির্মমতা জনসম্মুখে উন্মোচিত হয়। বরগুনার নয়ন বন্ড তার ০০৭ গ্রুপ নিয়ে জনসম্মুখে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করলে দেশব্যাপী আবারও কিশোর গ্যাংয়ের বর্বরতা সামনে আসে। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে চট্টগ্রামের জামাল খান মোড়ে স্কুলছাত্র আদনান ইসফারকে খুন করে গ্যাং সদস্যরা। গত বছরের ৬ এপ্রিল চট্টগ্রামে এক স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার জেরে কিশোরদের দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়ার বিরোধ মেটাতে গেলে মনিহারি ব্যবসায়ী লোকমান রনিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত বছরের ২৬ আগস্ট চট্টগ্রামে খুন হয় দশম শ্রেণির ছাত্র জাকির হোসেন (সানি)। গত বছরের ১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আহাদ আলম শুভ মিয়া নামের এক যুবককে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা এবং ১০ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলাকালে আত্মরক্ষার্থে শীতলক্ষ্যা নদীতে ঝাঁপ দেয় দুই শিক্ষার্থী। পরে তাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৬ মে রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশুসন্তানের সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাহিনুদ্দিন নামের এক যুবককে। হত্যাকারী সুমনের গ্যাং সদস্যদের ‘গডফাদার’ সাবেক এমপি এমএ আউয়ালের পরিকল্পনায় এ হত্যাকা- ঘটে বলে ডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের তথ্যমতে, কেন্দ্রে থাকা কিশোরদের ২০ শতাংশ হত্যা এবং ২৪ শতাংশ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ দেশব্যাপী শত শত কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। করোনাকালেও তারা মারামারি, খুনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ পরিচালনা করছে।

এখনকার কিশোরেরা মা-বাবার সঙ্গে তর্কে জড়াচ্ছে, মা-বাবাকে খুনের ঘটনাও এখন মামুলি। কিশোর গ্যাং নির্দ্বিধায় একের পর এক অন্যায় করেও তাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে বলে পার পেয়ে যাচ্ছে। প্রচলিত আইনে ১৮ বছরের নিচে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বড় কোনো শাস্তির পরিবর্তে তাদের পাঠানো হচ্ছে গাজীপুরে কিশোর শোধনাগারে। শিশু-কিশোরদের মানসিক-বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে অভিভাবকদের আরও যতœবান হওয়া, ছেলেমেয়েকে উঠতি বয়সে কী করছে না করছে সব সময় খোঁজখবর রাখা এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশে সময় দিয়ে পারিবারিক বন্ধন জোরদার করার পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা প্রদান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা, বিতর্ক প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন আয়োজনের ব্যবস্থা করা, স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনসহ শিক্ষকদের মোটিভেশনাল ভূমিকা রাখা, গণমাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ ও অনুষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত, দরিদ্র শিশু-কিশোরদের সুশিক্ষার ব্যবস্থা, কিশোর গ্যাং নির্মূলে গ্যাং হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা থেকে বিরত থাকা, পাড়া-মহল্লায় কমিটি গঠন করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, জুমার খুতবায় কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া, কিশোর উন্নয়নে পাঠিয়ে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মানসিকভাবে সংশোধনের ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীরা যাতে লেখাপড়া ব্যতীত অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারে সেই ব্যাপারে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে।

আমাদের দেশে পর্যাপ্ত কিশোর সংশোধন কেন্দ্র নেই। গাজীপুরে দুটি এবং যশোরে একটি শিশু কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র আছে। এর মধ্যে গাজীপুরের একটি মেয়েদের জন্য। সব মিলিয়ে এ তিনটির ধারণক্ষমতা মাত্র ৬০০ জনের। এ কারণে আটক শিশুদের বড় একটি অংশের উন্নয়ন কেন্দ্রে জায়গা হয় না তাই কারাগারেই থাকে। আবার আদালতের নির্দেশে কোনো কিশোরকে উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর কিছুদিন পর সে জামিনে বেরিয়ে এসে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। স্কুল কর্তৃপক্ষের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে- ক্লাস ঠিকমতো হচ্ছে কিনা; স্কুলে মাদক সেবন, র‌্যাগিং ইত্যাদি হচ্ছে কিনা। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও এগিয়ে আসতে হবে। গ্যাং সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে ডাটা বেইজ তৈরি করতে পারলে এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ। যেসব স্থানে গ্যাং সদস্যরা আড্ডা দেয়, সেসব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরব উপস্থিতি থাকতে হবে। গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক ও নিয়ন্ত্রকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। যে কোনো ধরনের অপরাধ বড় রূপ নেওয়ার আগে অপরাধীকে গ্রেফতার করতে হবে। এভাবে শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল কাজের পরিবেশ তৈরি করে দিলে এবং উন্নয়নমূলক কাজের দিকে আগ্রহী করে তুলতে পারলে বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং নামক দুঃস্বপ্নের আধিপত্য কমে যাবে বলে আশা করা যায়। সাধারণভাবে ‘ওরা পোলাপান’ বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। ইতোমধ্যে বড় বড় অঘটন বখাটে কিশোররা ঘটিয়ে ফেলেছে। পরবর্তী প্রজন্মকে রক্ষার লক্ষ্যে এখনই এর লাগাম টেনে ধরা দরকার।

 

নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া : কলাম লেখক

সূত্র: খোলাকাগজ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com

 www.bdallbanglanewspaper.com

Design & Developed BY Creative Zoone IT