মঙ্গলবার, ২৭ Jul ২০২১, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় ১৪দিনের সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা

চুয়াডাঙ্গায় ভারত সীমান্তবর্তী উপজেলা দামুড়হুদায় ১৪ দিনের লকডাউন দিয়েছে প্রশাসন। ১৪ জুন সোমবার দুপুরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক সভা শেষে এ ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক। এর আগে উপজেলার ক’একটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম লকডাউনে ছিল।
এদিকে চুয়াডাঙ্গায় নতুন করে  সোমবার ৫০জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। সোমবার রাতে চুয়াডাঙ্গার স্বাস্থ্যবিভাগ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ১৪ জন, আলমডাঙ্গা উপজেলার ৪ জন, দামুড়হুদা উপজেলার ২৫ জন এবং জীবননগর উপজেলার ৭ বাসীন্দা। আক্রান্তের হার ৪৭ দশমিক ১৬ ভাগ।

গত  রবিবার আরও ৫৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। জেলায় ২৪ ঘণ্টার হিসেবে এটাই ছিলো সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ড।
উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্রে জানা গেছে, ২ জুন থেকে দামুড়হুদার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের সাতটি গ্রাম এবং পরে ৫ জুন থেকে কুড়ুলগাছী ও পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের আরও নয়টি গ্রামে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ওই পদক্ষেপ পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয় নি। ফলে এসব এলাকায় করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

জরুরী এই পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণের জন্য সোমবার দুপুরে দামুড়হুদা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার ছাড়াও পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলি মুনছুর, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলারা রহমান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু হেনা মোহাম্মদ জামাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দামুড়হুদা উপজেলাকে পুরোপুরি ১৪ দিনের লকডাউন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

সভা শেষে বেলা দুইটায় জেলা প্রশাসক এবং জেলা কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দামুড়হুদা উপজেলাকে পুরোপুরি ১৪ দিনের লকডাউন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

সভায় অংশগ্রহণের আগে জেলা প্রশাসক বলেছিলেন, ‘লকডাউন যাঁরা বাস্তবায়ন করবেন, তাঁদের মতামতের প্রয়োজন আছে। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জনগণের-অংশগ্রহণ বা জনগণের সহযোগিতা-সম্পৃক্ততা। এলাকাবাসী সহযোগিতা করলেই আমরা এই মহামারির হাত থেকে রক্ষা পাব।’

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ার আরটিপিসিআর ল্যাব থেকে চুয়াডাঙ্গার ১৩২ জনের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এই ১৩২ জনের ৫৭ জন করোনা ‘পজিটিভ’। শনাক্তের হার ৪৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। গত এক সপ্তাহে জেলায় গড় শনাক্তের হারও ৪৩ শতাংশ।

যেখানে জাতীয়ভাবে করোনা শনাক্তের হার গত ২৪ ঘণ্টায় ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশ, সেখানে চুয়াডাঙ্গায় শনাক্তের এই হারকে উদ্বেগজনক বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে ভারত সীমান্তবর্তী দামুড়হুদায় করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় উদ্বেগ বাড়ছে। জেলায় নতুন যে ৫৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে, তার মধ্যে ৩৫ জনই দামুড়হুদা উপজেলার। অন্যদের মধ্যে সদর উপজেলার ১৩ জন, জীবননগর উপজেলার ৭ জন এবং আলমডাঙ্গার ২ জন।

চুয়াডাঙ্গা-২ (দামুড়হুদা-জীবননগর) আসনের সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলী আজগার টগর বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকায় করোনা শনাক্তের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি হতদরিদ্রদের বাড়ীতে এক সপ্তাহ ধরে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি পরিবার পাচ্ছে ২০ কেজি করে চাল, ১ কেজি মসুর ডাল, ১ লিটার সয়াবিন তেল, ৩ কেজি আলু, ১ কেজি পেঁয়াজ, লবণ ও সাবান। এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাবে, চুয়াডাঙ্গায় মোট ১০ হাজার ৬৬৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ২ হাজর ২৭৯ জনের। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৮৬ জন ইতিমধ্যে সুস্থ হয়েছেন। অন্তত ৭১ জন করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন। বর্তমানে ২৮৩ জন বাড়ীতে আইসোলেশনে আছেন। এ ছাড়া ৩৬ জনকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল ও তিনটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে; তিনজনকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন এ এস এম মারুফ হাসান বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা শহরে ১৯৫ শয্যার ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতালের পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলায় আইসিইউ না থাকলেও নিরবচ্ছিন্নভাবে উচ্চশক্তির অক্সিজেন সরবরাহের জন্য ৬ হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে।

এদিকে,  সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দামুড়হুদা উপজেলা পরিষদের সভা কক্ষে উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিলারা রহমানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি থেকে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন- পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলি মুনছুর বাবু।

এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন- এনএসআই উপ-পরিচালক জামিল ছিদ্দিক, উপজেলা আ’লীগের সভাপতি সিরাজুল আলম ঝন্টু, সাধারণ সম্পাদক মাহ্ফুজুর রহমান মঞ্জু, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শাহিদ খাতুন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিষ্ট্রেট সুদীপ্ত কুমার সিংহ , উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু হেনা মোহাম্মদ জামাল শুভ, আব্দুল ওদুদ শাহ ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ কামাল উদ্দীন, জেলা পরিষদের সদস্য শফিউল কবির ইউসুফ, দামুড়হুদা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল খালেক, দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল মতিন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সাকি সালাম,উপজেলা আনসার ও জিডিপি’ র প্রশিক্ষক আশরাফুল ইসলাম, দামুড়হুদা সদর ইউপি চেয়ারম্যান শরিফুল আলম মিল্টন, কার্পাসডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান ভুট্টু, জুড়ানপুর ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন, কুড়ালগাছী ইউপি পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ্ এনামুল কবীর ইনু, পারকৃষ্ণপুর মদনা ইউপি চেয়ারম্যান জাকারিয়া আলম, নাটুদহ ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম, হাউলী ইউপি চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন, নতিপোতা ইউপি চেয়ারম্যান ইয়ামিন আলি, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ উপজেলার কর্মরত সকল সাংবাদিক বৃন্দ।

লকডাউনে যে সকল বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে সেগুলো হলোঃ মহাসড়ক, আঞ্চলিক -মহাসড়ক নৌ পথে বা অন্য কোনো জেলা থেকে কেউ দামুড়হুদা উপজেলাতে প্রবেশ ও এ উপজেলা থেকে কেহ অন্যত্র গমন করতে পারবে না। সকল ধরণের যান চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি পরিসেবা ওষুধ, চিকিৎসা সেবা, কৃষি পণ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য সামগ্রী পরিবহন সংগ্রহসহ ব্যাংকিং সেবা সীমিত পরিসরে লকডাউনের আওতামুক্ত থাকবে। শপিংমলসহ অন্যান্য দোকানপাট বন্ধ থাকবে। খাবারের দোকান হোটেল, রেঁস্তোরায় খাবার বিক্রয় ও সরবরাহ করা যাবে। কোনো অবস্থায় হোটেল ও রেঁস্তোরায় বসে খাওয়া যাবে না। তবে, কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সকাল দোকান স্বাস্থ্য বিধি মেনে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবেন। বাধ্যতামূলক মাস্ক পরিধানসহ স্বাস্থ্যবিধি পতিপালন করতে হবে। জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ আজ মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে আগামী ২৮ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। অন্যথায় এ আদেশ অমান্যকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন মাঠ প্রশাসন। কোভিড-১৯ প্রতিরোধকল্পে ও জনস্বার্থে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা কাজে নিয়জিত থাকবেন একাধিক নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com

 www.bdallbanglanewspaper.com

Design & Developed BY Creative Zoone IT