শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ০৯:২০ অপরাহ্ন

শিরোনাম
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কৃষকের লাশ উদ্ধার গাংনীতে এক কৃষককে ফাঁসানোর অভিযোগ আজ ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস ॥ সীমিত পরিসরে পালনের প্রস্তুতি উপজেলা ভাইসচেয়ারম্যান টুপি সহিদুলের কিল-ঘুষিতে বৃদ্ধ ইস্রাফিল নিহত জুয়ার আসর থেকে নগদ টাকা-জুয়াখেলার সরঞ্জামসহ গ্রেফতার-২ বেগমপুরের হরিশপুর সড়কের গাছ চুরিকালে চোর পাকড়াও দামুড়হুদার ডুগডুগী কাঁচাবাজার তদারকী করলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিলারা চুয়াডাঙ্গায় করোনা পরিস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ সবজি ভ্যান কার্যক্রমের উদ্বোধন গাংনীর কাজীপুরে অগ্নিকাণ্ডে ৪টি বসতবাড়ী ভস্মীভূত ॥ ১০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি ঝিনাইদহের গণিত-পদার্থ বিজ্ঞানের এক সময়ের মেধাবী ছাত্রের দিন কাটে পথে পথে

তাজউদ্দীন ও সৈয়দ নজরুলের অর্থনৈতিক মতান্তরে ভারসাম্য এনেছিলেন বঙ্গবন্ধু

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গোটা জাতির দৃষ্টি তার দিকে। সবার আশা, দীর্ঘ পরাধীনতার বেড়ি কেটে মুক্ত হওয়া বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথ দেখাবেন বঙ্গবন্ধু।

ওই পরিস্থিতিতে অর্থনীতির পুনর্গঠনই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চারদিকে তখন ধ্বংসযজ্ঞের নমুনা। অবকাঠামো বলতে কিছুই নেই। ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি।

বঙ্গবন্ধু যে সময় দেশে ফেরেন, ঠিক সে সময় বাংলাদেশের পরিস্থিতির একটি বর্ণনা তুলে ধরেছিল টাইম ম্যাগাজিন। সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য ছিল, ‘গত মার্চে (১৯৭১) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ধ্বংসলীলার পর বিশ্বব্যাংকের একদল পর্যবেক্ষক দেখতে পেয়েছেন, কোনো কোনো শহরের অবস্থা ছিল যেন ঠিক পারমাণবিক আক্রমণের পর মুহূর্তের চিত্র। ওই সময়ের পর থেকে ধ্বংসের মাত্রা শুধুই বেড়েছে। বাণিজ্যিক প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেরই মালিকানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের। যুদ্ধের শেষ দিনগুলোয় এগুলোসহ পশ্চিম পাকিস্তানিদের মালিকানাধীন সব ব্যবসার তহবিলই স্থানান্তরিত হয়েছে পশ্চিমেই।’

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না। বিশেষ করে ১৯৭২ সালের শুরুটায়। ওই সময় বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির মাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় চরমে। বৈশ্বিক অর্থনীতির সে দুর্দশার ঢেউ এসে পড়েছিল বাংলাদেশেও। ঠিক এমনই এক সময় পুনর্গঠনের পথে দেশের হাল ধরেন বঙ্গবন্ধু।

পুনর্গঠনের পথে শুরুতেই বঙ্গবন্ধুকে একটি প্রশ্নের সমাধান করতে হয়। সেটি হলো বাংলাদেশ কোন পথে যাবে? সমাজতন্ত্র, না পুঁজিবাদ? এ প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন সরকারের ঊর্ধ্বতন নেতারাও।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সমর্থক। এ কারণে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত দেশগুলোর কাছ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা নেয়ারও বিপক্ষে ছিলেন তিনি। অন্যদিকে শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন মিশ্র অর্থনীতির পক্ষে। শুরুতে সমাজতান্ত্রিক মডেলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পথ বেছে নেন বঙ্গবন্ধু। যদিও পরে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে এলে উভয় দৃষ্টিভঙ্গির ভারসাম্য পূর্ণ প্রয়োগের প্রয়াস চালান তিনি।

তবে শুরুতে প্রশ্নটির সমাধান সামনে নিয়ে এসেছিলেন প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা। ১৯৭২ সালে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন, আনিসুর রহমান ও রেহমান সোবহানকে নিয়ে গঠন করা হয় প্রথম পরিকল্পনা কমিশন। প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরাও সে সময় সমাজতান্ত্রিক মডেলে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পক্ষে মত দেন। কমিশনের প্রস্তাব ছিল, বড় বড় শিল্প ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ তৎকালীন ১৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি সংবলিত সব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হোক।

এ প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীতে সব বড় শিল্প ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। এর ধারাবাহিকতায় পাট, পোশাক, চিনি, লৌহ ও ইস্পাত, কাগজ ও কাগজের পণ্য, বনজ শিল্পে প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানা। এছাড়া সে সময় ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগসীমাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে শিল্প খাতের মোট সম্পদে রাষ্ট্রের মালিকানা ছিল ৩৪ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ করে নেয়ায় ১৯৭২ সালেই এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ শতাংশে। অন্যদিকে ব্যক্তি খাতের মালিকানা নেমে আসে ৮ শতাংশে। ওই সময় জাতীয়করণ করে নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার স্বার্থে গঠন করা হয় ১০টি নতুন করপোরেশন।

অন্যদিকে আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণের পাশাপাশি গঠন করা হয় বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি), বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক, বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানও সে সময়ই গঠন করা হয়।

ভূমি ব্যবস্থায়ও বড় সংস্কার আনেন বঙ্গবন্ধু। পরিবারপ্রতি জমির সর্বোচ্চ মালিকানা বেঁধে দেয়া হয় সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা পর্যন্ত। সর্বোচ্চ ২৫ বিঘা পর্যন্ত মালিকানার পরিবারগুলোকে রাখা হয় ভূমিকরের আওতার বাইরে।

এসব সংস্কারের কিছু ফলও পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরের মধ্যেই দেশের জিডিপির পরিমাণ ১৯৬৯-৭০-এর পর্যায়ে ফিরে আসে। যুদ্ধোত্তর দেশের মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপক মাত্রায় বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লেও ঋণ সংকোচন ও উচ্চমূল্যের নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাড়ছিল শিল্প উৎপাদনও।

কিন্তু এর পরও বঙ্গবন্ধুর জন্য পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শিল্প কাঠামো রফতানি বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট ছিল না। রফতানি পণ্য বলতে ছিল মূলত পাট ও পাটজাত পণ্য। মোট রফতানিতে এর অবদান ছিল ৮৫ শতাংশেরও বেশি।

বৈশ্বিক অর্থনীতির সে দুর্যোগকালে পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি থেকে অর্জিত আয় কমছিল বাংলাদেশের। ১৯৬৯-৭০ সালেও পূর্ববঙ্গের পাট রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ৩৬৯ কোটি টাকা। ১৯৭৩-৭৪ সালের মধ্যে এ থেকে বাংলাদেশের আয় নেমে আসে ২৯৮ কোটি টাকায়।

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মতো স্বাধীনতার পর পরই একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ১৯৭১-৭২ অর্থবছরেই দেশে খাদ্য সরবরাহ কমে যায় স্বাধীনতা-পূর্বকালের তুলনায় ১৩ শতাংশ। পরে ১৯৭২-৭৩ সালের ভয়াবহ খরায় আউশ ও আমন ধানের উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ভিক্ষের পদধ্বনিও শোনা যাচ্ছিল শুরু থেকেই। পরিস্থিতি মোকাবেলায় খাদ্য আমদানি বাড়াতে হয়। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে শুধু খাদ্যই আমদানি করতে হয়েছে ৭৩২ কোটি টাকার। তবে তা-ও ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

আমদানি-রফতানির এ বিশাল ব্যবধানের ধারাবাহিকতায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেয়। উপরন্তু বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বাড়ছিল ক্রমাগত। ফলে প্রয়োজন সত্ত্বেও আমদানি বাড়ানো যাচ্ছিল না। অন্যদিকে দেশেও কালোবাজারিদের অপতত্পরতা বাড়ছিল। এ কারণে স্থানীয় বাজারে দ্রব্যমূল্য হয়ে ওঠে আকাশচুম্বী।

সীমিত সম্পদ ও শাসন ব্যবস্থায় অনভিজ্ঞতার কারণে ওই সময় আরো অনেক সমস্যা তৈরি হয়। বিনিয়োগ সীমা সীমিত থাকার কারণে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণের সুযোগও ছিল কম। আসছিল না বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও। এ অবস্থায় অর্থনীতির আরো উদারীকরণের দিকে পা বাড়ান বঙ্গবন্ধু।

১৯৭৪ সালের ১৬ জুলাই শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম নতুন এক বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের সীমা বাড়িয়ে করা হয় ৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের সীমা তুলে দেয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন করে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ কার্যক্রমকে ১৫ বছরের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

এছাড়া নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের সাত বছরের কর অব্যাহতি ঘোষণার পাশাপাশি অন্যান্য সুবিধাও দেয়া হয়।

একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন পুঁজিবাদী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নেও সচেষ্ট হন। ১৯৭৪ সালের জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য ও সরকারের কর্মকর্তাদের এসব দেশে সফরে পাঠান তিনি। সংকট মোকাবেলার জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এবং উন্নত বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে দাতা সহায়তার প্রতিশ্রুতিও আনতে সক্ষম হন বঙ্গবন্ধু।

এর ফলে ওই বছরের নভেম্বরের মধ্যেই নগদ ও জরুরি সহায়তা হিসেবে প্রায় ৪০ কোটি ডলার আদায় করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ঋণ হিসেবে আসে আরো সাড়ে ১৪ কোটি ডলার। ১৯৭৪ সালের আগস্টে প্যারিসে নয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং জাপান, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ (ইউএই) সমাজতান্ত্রিক ব্লকের বাইরের ১৭টি দেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ এইড গ্রুপ। ওই কনসোর্টিয়ামে শুধু অনারব দেশগুলো থেকেই সহায়তার প্রতিশ্রুতি আসে ৬০ কোটি ডলারের। আরো অনেক সহায়তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়ে আসে পেট্রোডলারসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোও।

ওই বছরেই সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সাতটি বিদেশী জ্বালানি তেল কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি ছিল তিনটি। এ চুক্তিসই বাবদ বাংলাদেশের হাতে আসে ৩ কোটি ডলার।

১৯৭৪ সালেই অক্টোবরের শেষ দিকে বাংলাদেশ সফরে আসেন তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘোর বিরোধী কিসিঞ্জারের এ সফরের ব্যাপ্তি ছিল প্রায় ১৯ ঘণ্টা। এ সময় তিনি বঙ্গবন্ধুকে বর্ণনা করেন ‘অত্যন্ত ধীশক্তির অধিকারী একজন মানুষ’ হিসেবে। একই সঙ্গে ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া ‘বাংলাদেশের অস্তিত্বও থাকত না’।

 

সূত্র: বণিকবার্তা

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com

 www.bdallbanglanewspaper.com

Design & Developed BY Creative Zoone IT