সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় কৃষকের লাশ উদ্ধার গাংনীতে এক কৃষককে ফাঁসানোর অভিযোগ আজ ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস ॥ সীমিত পরিসরে পালনের প্রস্তুতি উপজেলা ভাইসচেয়ারম্যান টুপি সহিদুলের কিল-ঘুষিতে বৃদ্ধ ইস্রাফিল নিহত জুয়ার আসর থেকে নগদ টাকা-জুয়াখেলার সরঞ্জামসহ গ্রেফতার-২ বেগমপুরের হরিশপুর সড়কের গাছ চুরিকালে চোর পাকড়াও দামুড়হুদার ডুগডুগী কাঁচাবাজার তদারকী করলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিলারা চুয়াডাঙ্গায় করোনা পরিস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ সবজি ভ্যান কার্যক্রমের উদ্বোধন গাংনীর কাজীপুরে অগ্নিকাণ্ডে ৪টি বসতবাড়ী ভস্মীভূত ॥ ১০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি ঝিনাইদহের গণিত-পদার্থ বিজ্ঞানের এক সময়ের মেধাবী ছাত্রের দিন কাটে পথে পথে

পাবজি-ফ্রি ফায়ার গেমে আসক্ত হচ্ছে উঠতি বয়সের যুবকরা

শখের বশে অপসংস্কৃতি আর বিকৃত মস্তিষ্কের দোরগোড়ায় নতুন প্রজন্ম

বাচ্চাকে শান্ত রাখার জন্য অভিভাবকেরা তার হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্টফোন বা ট্যাব

মোবাইল বা ভিডিও গেমে আসক্তিকে মনঃস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মাদকাসক্তির মতো ইন্টারনেটে মাত্রাতিরিক্ত থাকা বা গেম খেলাও আসক্তি। এটা আচরণগত আসক্তি। কেবল সচেতনতাই পারে এই আসক্তি থেকে মুক্ত করতে। লিখেছেন মনোরোগ চিকিৎসক আহমেদ হেলাল। (সংগৃহিত)
বর্তমানে শিশুদের সিংহভাগ সময় দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। এখন শিশুরা সাধারণত মোবাইল টেলিভিশন, স্মার্টফোন, ট্যাব, ইউটিউবে সময় কাটায়। এটা অনেকেই ভালোভাবে দেখে। কিন্তু এই প্রযুক্তির কারণে শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল রাখছে না অনেকেই।
চুয়াডাঙ্গা জেলায় দিন দিন ইন্টারনেট ফাইটিং ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেমসে ঝুঁকছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। উপজেলার উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীরা ও পুরো যুব সমাজ দিন দিন ফ্রি ফায়ার ও পাবজি নামক গেমের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। যে সময় তাদের ব্যস্ত থাকার কথা নিয়মিত পড়ালেখাসহ শিক্ষা পাঠ গ্রহণ নিয়ে ও খেলার মাঠে ক্রীড়া চর্চার মধ্যে, সেখানে তারা ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে জড়িয়ে পড়ে নেশায় পরিণত করছেন।
বাবা-মা আর সন্তানের সম্পর্কটা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর আর মজবুত সম্পর্ক। অপরদিকে এই সম্পর্ক স্বর্গীয় সুখের অংশ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রত্যেক পিতা-মাতাই সন্তানের প্রতিষ্ঠিত রূপ দেখে যেতে চাই। সকলেই চাই সন্তানেরা সমাজের বুকে আদর্শ এবং অহংকার হিসাবে জায়গা করে নিবে। কুলি, মজুর থেকে শুরু করে কোটিপতি, শিল্পপতি সকলেই চাই সন্তান বড় হোক এবং মানুষের মত মানুষ হোক এবং এই একই গতানুগতিক ধারায় পৃথিবী চলে আসছে। অনেক সময় পিতা-মাতা বা অভিভাবকদের উদাসীনতা, বে-খেয়ালে সন্তানেরা ঝরে পড়ে। বখে যায় অসামাজিক হয়ে যায়। তেমনি কিছু বিষয় ইদানীং নিত্য চোখেপড়ার মত। নিজেরা একটু ফ্রি থাকার জন্য, মমতা মিশ্রিত শাসন-বারণ ভুলে গিয়ে বেশীরভাগ পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্ট ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ইত্যাদি। ঘন্টার পর ঘন্টা রিমোর্ট কন্ট্রোলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বসিয়ে রাখছেন টিভির সামনে।
অবশ্য যেটা তাদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর। বিশেষ করে ‘গাল টিপলে দুধ বের হয়’ এরকম শিশু বাচ্চাদের হাতেও এখন স্মার্ট ফোন। যে বাচ্চা এখনো ঠিক মত অ, আ, ক, খ অথবা অ, ই, ঈ, উ বলতে পারে না অবাক করার মত বিষয় সেইসব বাচ্চারা এখন ফ্রি-ফায়ার, পাবজি’র মত গেইম খেলে। অনেক বাবা-মা নির্লজ্জ, বেহায়ার মত সাফাই গেয়ে বলে ওঠেন যে আমার ছেলেটা মোবাইল হাতে না দিলে কিছুই খায়ই না।
কোন মা আবার বলেন- ও সারাদিন গেইম খেলে বলেই তো কোন ঝামেলা নেই, আমরা নিশ্চিন্তে পরিবারের সমস্ত কাজগুলো করতে পারি। এই সমস্ত পিতা-মাতাকে একটু জানিয়ে দিতে চায়; আপনার একটু উদাসীনতা আপনার বাচ্চার আগামীর জন্য যে কি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে? সেটা এখনো একটু বোঝার চেষ্টা করুন। যে বয়সে বাচ্চাদের থাকার কথা ছিল, দাদা-দাদী অথবা নানা-নানীর কোলে সেই বয়সে বাচ্চারা এখন স্মার্ট ফোনে ফ্রি-ফায়ার অথবা মোটু-পাতলু, কার্টুন নিয়ে ব্যস্ত। স্নেহমমতা’র সম্পর্কটা কি সেটা এখনকার প্রজন্ম আর বুঝতে চাই না বা বোঝার সুযোগ পাচ্ছে না।
এ ছাড়া বিশেষ করে ৮ বছর থেকে ২১ বছরের উঠতি বয়সের যুবকরা প্রতিনিয়ত অ্যান্ড্রয়েড ফোন দিয়ে এসব গেইমে আসক্ত হচ্ছেন। এসব বিদেশী গেম থেকে শিক্ষার্থী বা তরুণ প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে বড় ধরণের ক্ষতির আশঙ্কা দেখছেন সচেতন মহল।
শুধু খেলায় ক্ষান্ত হলে হইতোবা কিছুটা বাঁচতো বাংলাদেশ। কিন্তু ইউসি ক্রয় ও ডায়মন্ড টপ আপের নামে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, পাবজি ও ফ্রি ফায়ার নামক মরন গেমস। একজন অসচ্ছল পরিবারের সন্তান ডায়মন্ড ও ইউসি কেনার টাকা যোগান দিতে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপকর্মে। মাদক বিক্রয় ও কিছু টাকার বিনিময়ে মাদক সেবিদের কাছে মাদক পৌছে দেওয়া তার মধ্যে অন্যতম মাধ্যম। কোমল মতি শিশুদের ১০ টাকা-২০ টাকা জমিয়ে যেখানে ক্রিকেট বল ফুটবল কেনার কথা, সেখানে তারা টাকা জমিয়ে রাখছে ইউসি/ ডায়মন্ড কেনার জন্য।
ফায়ার গেমসে অনুরাগীরা জানান, ‘প্রথমে তাদের কাছে ফ্রি ফায়ার গেমস ভালো লাগত না। কিছুদিন বন্ধুদের দেখাদেখি খেলতে গিয়ে এখন তারা আসক্ত হয়ে গেছেন। এখন গেমস না খেলে তাদের অস্বস্তিকর মনে হয় বলে জানা যায় ।
আরেক ১জন শিক্ষার্থী জানায়, ‘তিনি পূর্বে গেমস সম্পর্কে কিছু জানতেন না। এখন নিয়মিত ফ্রি ফায়ার গেমস খেলেন তিনি। মাঝে মধ্যে গেমস খেলতে না পারলে মুঠোফোন ভেঙে ফেলার ইচ্ছাও হয় তার। তিনি আরো বলেন, ফ্রি ফায়ার গেমস যে একবার খেলবে সে আর ছাড়তে পারবে না বলে দাবী করেন তিনি।
ক্রিকেট ফুটবল খেলার মাঠগুলো এখন খা খা করে, কোন খেলোয়াড় নেই। খেলার মাঠগুলো’র চাইতে বাঁশবাগান, কলাবাগান আর ঝোঁপঝাঁড়ের মধ্যো শিশু-কিশোরদের ভিড় বেশী থাকে। বিকেল হলে যদিও ক’একজন বাড়ীতে বলে আসে যে ‘খেলতে যাচ্ছি’ অথচ তারাও খেলার মাঠে গিয়ে দর্শকের সারিতে বসে অনেকটা ‘সাপের খেলা’ দেখানোর আদলে বসে শুরু করে ফ্রি-ফায়ার আর পাবজি। কেউ কেউ বাজিতে বসে যায় ‘লুডো’ নিয়ে। দিন শেষে খেলা শেষ হওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় শেষ হয় বন্ধুত্বের সম্পর্ক। শেষ হয় সম্প্রীতি। নামীদামী লেখকদের বই আর এই প্রজন্ম পড়তে চাই না। এঁরা না চাই আবৃতি শিখতে; না চাই বিতর্ক প্রতিযোগিতার চর্চা করতে; না পারে হারমোনিয়াম, ডুগি-তবলা, গিটার নিয়ে বসতে। ভার্চুয়াল জগতে ডুবে থাকা আজকের কিশোরেরা না পারে ‘প্রিয়তমা’র কাছে মনের মাধূরী মিশিয়ে একটা পত্র লিখতে, না পারে হৃদয় দিয়ে বর্ণনা করতে ‘হাজার বছর ধরে’ অথবা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র ইতিকথা।
এভাবেই চলতে থাকলে, আগামীতে সবচেয়ে বেশী বিপদগ্রস্ত হবেন বৃদ্ধ বাবা-মা। কারণ এই অতিরিক্ত ভার্চুয়ালিটি সন্তানদের মস্তিষ্ক বিকৃতির পাশাপাশি তাদের অনুভূতিগুলো নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এই সন্তানগুলো একসময় নিজের গর্ভধারিণী ‘মা’ কে একটা শাড়ী কিনে দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিবে, ‘আজ আমার আম্মুকে একটা শাড়ী কিনে দিলাম, কেমন হল বন্ধুরা? অথচ তার জানার কথা ছিল যে মায়ের প্রতি একটা সন্তানের কর্তব্য কতখানি। এই সন্তানগুলো একসময় নিজের জন্মদাতা পিতাকে কবরে দাফন করার পর পরই ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লিখবে ‘এই মাত্র আব্বুকে কবরে শোয়ালাম, সবাই দোয়া করবেন’। অথচ তার জানার কথা ছিল, সদ্য মৃত বাবার জন্য একটা সন্তানের কতখানি শোক সইতে হয়। যেহেতু তার মস্তিষ্ক অনুভূতিবিহীন; সেহেতু আবেগও এখানে নিষ্প্রয়োজনীও। তাই তার কাছে শোকে মুহ্যমান হওয়ার চেয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর ওয়েষ্টার্ন কালচার এর চর্চা এবং বৃদ্ধাশ্রম এর কথা না হয় নাই বা বললাম। বাবা মায়ের এই উদাসীনতা বাচ্চাদের পারিবারিক অনুশাসন থেকে বের করে ধাবিত করছে অপসংস্কৃতির পথে। থাকছে না ধর্মীয় শিক্ষা, থাকছে না শিষ্টাচার না থাকছে নিয়মানুবর্তিতা।
কোন কিছুর অভাব না থেকেও বাচ্চাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন পিতা-মাতা। যার একমাত্র কারণ হচ্ছে উদাসীনতা আর প্রশ্রয়। নিজের বাচ্চার হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে স্বামী, স্ত্রী নিজেরাও স্মার্ট ফোনের যাচ্ছে তাই ব্যবহার করছেন। সন্তানের ক্ষতির পাশাপাশি ব্যাপকহারে ক্ষতির মুখে আজ স্বামী স্ত্রীর গভীর সম্পর্ক। পরকীয়া, ডিভোর্স আর আত্মহত্যা নিত্যদিনের খবর। সব মিলিয়ে এ যেন মূল্যবোধ এর চরম অবক্ষয় পরিশেষে পিতা-মাতা, পরিবার, সরকার এবং প্রশাসন’র উচিত এই অবক্ষয়ের দিকে জোর নজরদারী করা এবং সময় উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

 

এ.এইচ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com

 www.bdallbanglanewspaper.com

Design & Developed BY Creative Zoone IT