মঙ্গলবার, ২৭ Jul ২০২১, ১১:৫১ পূর্বাহ্ন

ডাকাতিতে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্রসহ ৫ লক্ষ ৩ হাজার টাকা উদ্ধার ॥ ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে ডাকাতির পরিকল্পনা

আহসান আলম:

ক’এক লক্ষ টাকার ঋণে জর্জড়িত পাগলপ্রায় দিশেহারা ঔষধ ব্যবসায়ী রাসেল ভাইপো রকির সাথে গোপন সলা-পরামর্শ করে ব্যাংক লুটের পরিকল্পনা নেয়। ভারতীয় টিভি চ্যানেল ‘সনি আট’ এর ক্রাইম পেট্রোল সিরিয়ালের ছবি দেখে প্রশিক্ষণ নেয় রাসেল। সিসি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না থাকার কারণে তারা বেছে নেয় জীবননগর উথলী সোনালী ব্যাংকটিকে। তাদের গোপন পরিকল্পনা মাফিক গত ১৫ নভেম্বর প্রকাশ্য দিনের বেলা দুপুর বেলা সোয়া ১টার সময় খেলনা পিস্তল ব্যবহার করে ফিল্মিষ্টাইলে লুট করে ওই উথলী সোনালী ব্যাংকের ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯শ’ টাকা।


এই ব্যাংক ডাকাতি ঘটনার দীর্ঘ এক মাস পর জীবননগর থানা পুলিশ গত সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলা শহর থেকে ডাকাতির মুল হোতা জীবননগর উপজেলার দেহাটি গ্রামের ঔষধ ব্যবসায়ী সাফাতুজ্জামান রাসেলকে (৩০) গ্রেফতার করে। ওই একই রাতে রাসেলের স্বীকারোক্তিতে ডাকাত দলের অন্য সদস্য জীবননগর উপজেলার দেহাটি গ্রাম থেকে জাহাঙ্গীর শাহ্’র ছেলে রফি (২৩), মফিজুল শাহ্’র ছেলে মাহফুজ আহম্মেদ আকাশ (১৯) ও আখতারুজ্জামান বাচ্চু’র ছেলে হৃদয়কে (২২) গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময় তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংক থেকে লুট হওয়া নগদ ৫ লাখ ৩ হাজার টাকা উদ্ধার করে পুলিশ। ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত ১টি খেলনা পিস্তল, ১টি খেলনা রিভলবার, দু’টি চাপাতি, দু’টি হেলমেট, দু’টি মোটরসাইকেল, এক জোড়া হ্যান্ডগ্লভস ও একটি সাদা রংঙের পিপিই উদ্ধার করে পুলিশ।
লুট হওয়া টাকা উদ্ধার ও ব্যাংক ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত মালামাল উদ্ধারের বিষয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম । গতকাল মঙ্গলবার বেলা ৩ টার সময় চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এই প্রেস বিফিং।
প্রেসবিফিংয়ে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী বাজারে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত উথলী সোনালী ব্যাংক শাখায় বেলা সোয়া ১ টার সময় অজ্ঞাত দূর্বত্তরা অস্ত্রের মুখে ব্যাংক কর্মচারীদের জিম্মি করে টাকা লুট করে পালিয়ে যায়। এসময় তারা ব্যাংকের ক্যাশ বাক্স থেকে নগদ ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯০০ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই পুলিশ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জড়িতদের গ্রেফতারসহ লুট হওয়া টাকা উদ্ধারে নামে। পুলিশ সন্দেহভাজন বেশ ক’একজনের উপর কড়া নজরদারী শুরু করেন। এছাড়া, বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদেরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গতকাল সোমবার রাতে অভিযান চালিয়ে নগদ টাকা ও ব্যাংক লুটের খেলনা অস্ত্রসহ ব্যবহার সামগ্রী উদ্ধার করে পুলিশ।
ব্যাংক লুটের মুলহোতা ঔষধ ব্যবসায়ী সাফাতুজ্জামান রাসেল একজন পেশাদার অপরাধী ও খুবই চৌতুর প্রকৃতির। ক’এক লক্ষ টাকা ঋণগ্রস্থ থাকায় ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য উথলী সোনালী ব্যাংক শাখায় সিসি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরালো না থাকার সুযোগে বন্ধু হৃদয় ও রকিকে নিয়ে লুটের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে রাসেল।
জানা যায়, রাসেল তার বন্ধু হৃদয়কে নিয়ে এক সাথে অনেক টাকা উপর্যানের জন্য ব্যাংক লুটের পরিকল্পনা করে। সে নিজের ভাইপো রকিকে সংগে নিয়ে পিপি ও হ্যান্ডগ্লাভস পরে খেলনা পিস্তল নিয়ে ব্যাংকটিতে টাকা লুট করার কৌশল বেছে নেয়।
এদিকে, চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলামের নির্দেশনায় মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা জীবননগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ফেরদৌস ওয়াহিদ জানতে পরেন ব্যাংক লুটের ঘটনায় ব্যবহৃত খেলনা পিস্তল ও গুলি অনলাইন দারাজ ডটকম থেকে কেনা হয়েছে। তদন্তে দারাজের ডেলিভারী স্লিপ পুলিশের হাতে পৌঁছায়। মূল পরিকল্পনাকারী দূর্বৃত্ত সাফাতুজ্জামান রাসেল পার্সেল অর্ডারের মাধ্যমে দারাজ ডটকম থেকে খেলনা অস্ত্র কেনেন। পেপার ক্রয় কুরিয়ার সার্ভিস এর মাধমে খেলনা পিস্তল ও গুলি রাসেলকে সরবরাহ করা হয়। ঘটনার দিন ওই খেলনা অস্ত্র ব্যবহার করেই রাসেল, হৃদয় ও ভাইপো রকি উথলী সোনালী ব্যাংক শাখা থেকে অস্ত্রের মুখে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করে ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯শ’ টাকা লুট করে পালিয়ে যায়।
জীবননগর উপজেলার উথলী বাজারে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত উথলী সোনালী ব্যাংক শাখায় গত ১৫ নভেম্বর দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে ফিল্মিষ্টাইলে দুর্ধর্র্ষ ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হয়। বেলা সোয়া ১ টার সময় প্রথমে একজন পিপিই ও হেলমেট পরিহিত অবস্থায় উথলী বাজারে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের ভেতর প্রবেশ করে। এর ১ মিনিট পর ঢুকে পড়ে আরও দু’জন হেলমেট পরিহিত যুবক। এরপর তারা ৩ জন পিস্তল উচিয়ে ব্যাংকের দরজা বন্ধ করে ব্যাংকের নিরাপত্তা প্রহরীসহ সবার মুঠোফোনগুলো কেড়ে নেয়। এরপর তারা ব্যাংকের ব্যাবস্থাপক ও নিরাপত্তাকর্মীসহ ওই ব্যাংকে কর্মরত ৮ জনকে একটি কক্ষের সামনে বসিয়ে রাখে। পরক্ষণে তারা ব্যাংকের ভোল্টে রক্ষিত টাকাসহ কাউন্টারে থাকা মিলে মোট ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯শ’ টাকা লুট করে নেয়। টাকা লুটের পর ডাকাতদলের সদস্যরা ব্যাংক ভবনটির দো’তলা থেকে সিড়ি বেয়ে নির্বিঘ্নে নেমে যান। ওই সময়ে ব্যাংকের কর্মকর্তারা জরুরী সতর্ক সংকেত (ইমারজেন্সী হুইসেল) বাজান। সতর্ক সংকেত শুনে ব্যাংকের পার্শ্ববর্তী দোকানদাররা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং ডাকাত দলের সদস্যদেরকে ধাওয়া করেন। এ সময় ডাকাত দলের সদস্যরা পিস্তল উচিয়ে গুলি করার হুমকী দিলে ধাওয়াকারী দোকানদাররা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন এবং চিৎকার শুরু করেন। এ সুযোগে ডাকাতদল ব্যাংকের পেছনে রেখে দেওয়া লাল রঙের হিরোহোন্ডা মোটরসাইকেল যোগে পালিয়ে যাবার চেষ্ট করে। পালিয়ে যাবার সময় ডাকাতদল উথলী সূর্যতোরণ ক্লাবের সামনে গেলে আবার বাধাঁর মুখে পড়ে। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা আরিফুর রহমান মন্টুসহ ৫/৬ জন মোটরসাইকেল লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে একটা ইট ডাকাত দলের হেলমেটে লাগে। খবর পেয়ে উথলী বিশেষ ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা ও জীবননগর থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ডাকাত দলের ফেলে যাওয়া পিস্তলের অংশ বিশেষ উদ্ধার করে।
এদিকে, ঘটনার পর খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত অতিরিক্ত ডিআইজি নাহিদুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার, পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম, জীবননগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী হাফিজুর রহমান, জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মুনিল লিংকন, চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (দামুড়হুদা সার্কেল) আবু রাসেল, এনএসআই উপ-পরিচালক জিএম জামিল সিদ্দিক, সোনালী ব্যাংকের ফরিদপুর জিএম অফিসের জেনারেল ম্যানেজার-ইনচার্জ খোকন চন্দ্র বিশ্বাস ও জীবননগর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামসহ র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), ডিজিএফআই, ডিএসবি ও সিআইডির উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ ঘটনার পর ওই রাতেই ডাকাতি কবলিত উথলী সোনালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বাদী হয়ে জীবননগর থানায় অজ্ঞাত ৩ জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন।

 

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com

 www.bdallbanglanewspaper.com

Design & Developed BY Creative Zoone IT