শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ০৫:৫৪ পূর্বাহ্ন

হার্ড ইমিউনিটি নাকি ভ্যাকসিন

করোনাভাইরাস বিশ্ব জুড়েই দ্রুত গতিতে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এ ভাইরাসকে সার্স বা অন্যসব মামুলি ফ্লু ভাইরাস থেকে বেশি ক্ষতিকারক বলেই মনে করা হচ্ছে। সভ্যতার ইতিহাসে খুব কম উদাহরণ রয়েছে, যেখানে একটা রোগ এত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। সাত মহাদেশের জনসংখ্যার এক বড় অংশ সংক্রমিত। যত দিন যাচ্ছে, সংক্রমণের সংখ্যাও বাড়ছে। সারা বিশে^ এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই কোটিরও বেশি মানুষের মধ্যে সংক্রমণ হয়েছে। সাত লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দুই কোটি মানুষ সেরে উঠেছেন। মৃত্যুর হার ৫ শতাংশের কাছাকাছি।

করোনা কেন দ্রুত ছড়ায়?
করোনা কেন দ্রত ছড়ায়? বিজ্ঞানীদের মতে, ‘করোনাভাইরাস এত দ্রুত গতিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পরার কারণ হলো ‘জড় মান’। অর্থাৎ একজন সংক্রমিত মানুষ গড়ে কতজন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে তার পরিমাপ। এর ফলে হার্ড ইমিউনিটির ম্যাজিক নম্বরটার খুব দ্রুত সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।’ অর্থাৎ দ্রুত ছড়ালে গোষ্ঠীবদ্ধ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে। যেহেতু ভাইরাসকে হারানোর বিশ্বযুদ্ধটা আর পাঁচটা লড়াইয়ের চেয়ে বেশ কঠিন। তাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি বা হার্ড ইমিউনিটি অত্যন্ত জরুরি। বিজ্ঞানীরাও সাফ জানিয়েছেন, ‘করোনাভাইরাসকে হারিয়ে দেওয়ার অন্যতম শর্ত হলো হার্ড ইমিউনিটি বা গোষ্ঠীবদ্ধ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলা।’ এক্ষেত্রে লকডাউন করলে সংক্রমণ খানিকটা আয়ত্তের মধ্যে থাকে বৈকি! তবে লকডাউন প্রকৃত অর্থে কার্যকর হওয়া দরকার। অন্যথায় ধরে নেওয়া হয়, সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকলে এমন একটা সময় আসে, যখন জনসংখ্যার বাকি অংশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়ার প্রতিরোধশক্তি আপন মনে গড়ে ওঠে। এভাবে শরীরে একবার অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার পর নতুন করে কারও দেহে প্রবেশ করা ভাইরাসের সংক্রমণ হলে তার বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই করে অ্যান্টিবডি। হার্ড ইমিউনিটিতে তৈরি হওয়া টি-সেলগুলো অনেকটা ‘মেমরি চিপ’-এর মতো কাজ করে থাকে। অর্থাৎ ভাইরাসের সমস্ত বৈশিষ্ট্য আগেই টি-সেলগুলো শরীরে ধরে রাখে। ফলে ভবিষ্যতে ফের ওই ভাইরাসের সংস্পর্শে এলেও ওই টি-সেলগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারপর ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে। এভাবে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হলে সংক্রমণের হার ও মাত্রা কমে যায়। তবে অনেক গবেষক তত্ত্বটা মানতে নারাজ। তারা বলেন, ‘একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’ তৈরি হলে হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্ব কার্যকর হয়। তার আগে নয়।’ সত্যিই কি তাই?

হার্ড ইমিউনিটি কতদিন সুরক্ষা দেবে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘প্রথমে যদিও সংশয় ছিল, করোনার বিরুদ্ধে যথেষ্ট ইমিউন রেসপন্স বা শরীরের কোষে এবং রক্তে উপস্থিত কোনো বস্তুকে শরীর যখন চিহ্নিত করতে পারে না বা অচেনা কিছু বলে ঠাহর করে, তখন একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। শরীরের বাইরে থেকে কোনো বস্তু প্রবেশ করলে, সেই অ্যান্টিজেনের কারণে শরীরে একটা প্রতিক্রিয়া বা রেসপন্স তৈরি হয়। অ্যান্টিবডি রেসপন্স বা দ্রুত অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার ফলে টি-সেলগুলোও এক সঙ্গে যুক্ত থাকে।’ সম্প্রতি ব্রিটেনের এক গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায়, সেখানে ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে ইমিউন রেসপন্স করেছে। এর মানে কি? মানুষের শরীরের আপন মনে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে। অ্যান্টিবডি তৈরি করা বি-সেলের মতোই টি-সেলগুলোও করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জরুরি ভূমিকা পালন করছে। সেজন্যেই পুনঃসংক্রমণের পরিসংখ্যান খুব বেশি একটা দেখা যায় না। এতে প্রতীয়মান হয়, গোষ্ঠীবদ্ধ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড় সংখ্যক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সুরক্ষা প্রদান করে থাকে। সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা যাদের মধ্যে বেশি, হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হলে তারা অনেকটাই রক্ষা পাবেন। আর দীর্ঘস্থায়ী হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে গেলে সংক্রমণের হারও কমে যাবে। তবে চলতি হার্ড ইমিউনিটি কতদিন সুরক্ষা দেবে সে সময়টা বিশেষজ্ঞদের কাছে খুব স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী সময়টা হলো নয় মাস। কারণ বিগত নয় মাসে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুনঃসংক্রমণের ঘটনা ঘটলেও আশঙ্কাজনক মাত্রায় পুনঃসংক্রমণের কোনো প্রমাণ কোথাও নেই। গবেষকরা তাই বলেন, ‘যদি আরও মাস দুয়েক পর সে অর্থে বিশাল পুনঃসংক্রমণের খবর না আসে, তাহলে ধরে নেওয়া যাবে সময়কালটা আসলে ১১ মাস।’

ভ্যাকসিন কি সত্যিই আসছে?
সারা বিশ্বই ভ্যাকসিনের জন্য উতলা। আশায় দিন গুনছেন বিশ^বাসী। তাই বলে ভ্যাকসিন কাল চাই, পরশু চাই বলে ছুটে বেড়ালেও তো সমাধান হবে না। এতো ছেলের হাতের মোয়া নয়। শিশুর খেলনাও নয়। সময় তো দিতেই হবে বিজ্ঞানীদের। ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ সবে মাত্র মানবদেহে শুরু হয়েছে। এটা পুরোদস্তুর বিজ্ঞান। ‘ট্রায়াল অ্যান্ড অ্যারর’ মেথডের মধ্যে দিয়ে অতি সাবধানে এই অগ্নিপরীক্ষায় এগুতে হচ্ছে গবেষকদের। এ মুহূর্তে সঠিক ভ্যাকসিন বেরুলেও বাণিজ্যিক প্রয়োগ শুরু হতে বছর ঘুরে যেতে পারে। এটাই দস্তুর। তারপরও ভ্যাকসিন নিয়ে বিতর্ক রয়েই যায়। যেখানে অন্য রোগের ক্ষেত্রে কার্যকর ভ্যাকসিন বাজারে আসতে পাঁচ-দশ বছর লেগে যায়, সেখানে করোনার ক্ষেত্রে অনেকে মনে করছেন, ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত গবেষণার দিকটা নিশ্চয়ই আপস করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এসব ভ্যাকসিন মানুষের জন্য নিরাপদ কিনা? তবে একথা ঠিক কার্যকর আসল ভ্যাকসিন যতদিন বাজারে না আসছে, ততদিন গোষ্ঠী সংক্রমণ ঠেকিয়ে রাখা কারও সাধ্যি নেই। কাজেই সেক্ষেত্রে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে? বাকি ব্যাপারটা যার যার মতো অগ্রিম বুঝে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

হার্ড ইমিউনিটির জয় কতদূর?
বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাস যেভাবে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, সাধারণ একটা সফল ভ্যাকসিন তৈরিতে যতটা সময় লাগে, এ দুটো বিবেচনা করে দেখলে হার্ড ইমিউনিটি নিশ্চয়ই এগিয়ে থাকবে। অর্থাৎ একটা সঠিক ভ্যাকসিন আসার আগেই তৈরি হয়ে যাবে হার্ড ইমিউনিটি। অনেক বিশেষজ্ঞ এতে সহমত না হলেও কথাটা সত্যি। কারণ একবার গোষ্ঠীবদ্ধ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে গেলে, পরবর্তীতে হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্বটা সহায়ক হবে। তবে হ্যাঁ। সেক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সময়কালটাও তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ হতে হবে। গবেষকরা ধারণা করছেন, হার্ড ইমিউনিটি পুরোটা গড়ে ওঠার কাজ প্রাকৃতিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে। আবার ভ্যাকসিন থেকেও হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছে যাওয়ার সময়কাল সংক্রমণ কতটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে তার সঙ্গে সমানুপাতিক। পরবর্তীতে কতজনকে ভ্যাকসিন দিয়ে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলা গেল ওই সংখ্যার সঙ্গে সমানুপাতিক।’ তাদের যুক্তি- ‘দেশ ও এলাকাভেদে জীবনযাপনের ভিন্নতার জন্য জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই সংক্রমিত নাও হতে পারেন। এমনকি বাড়ির বয়স্ক সদস্যরাও সংক্রমিত নাও হতে পারেন।’ এমনটা হলে লক্ষ্যমাত্রাটা আরও কমে যাবে।

উপসর্গহীন করোনা: ভালো নাকি ভালো না?
বর্তমান করোনা পরিস্থিতির দিকে তাকালে আপাতদৃষ্টিতে যা মনে হয়, তার চেয়ে মৃত্যুর হার অনেকটা কম। এর কারণ মানব শরীর আপন মনে ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে বা অ্যান্টিবডি তৈরি করেছে। যা পরবর্তীতে শরীরকে আবারও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করবে। সুস্থ হয়ে ফেরা এসব ব্যক্তির ‘অ্যান্টিবডি’ তাই সংক্রমিত রোগীর শরীরে ঢোকালে ঐ শরীরে ‘প্যাসিভ ইমিউনিটি’ গড়ে ওঠে। তাই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর যারা প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, তাদের রক্ত থেকে অ্যান্টিবডি নিয়ে ওষুধ তৈরির প্রচেষ্টা দেশ-বিদেশে এখনো চলমান। এমন ওষুধ দিয়ে আক্রান্ত রোগীদের কয়েক সপ্তাহে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা যেতেই পারে। অ্যান্টিবডি শরীরে দীর্ঘদিন না থাকলেও টি-সেলগুলো অনেক বছর ধরে শরীরে থেকে যায়। তবে বাস্তবে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে জানা যায়নি, সেরে উঠলেও ঠিক কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে রোগে? এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, কাদের ক্ষেত্রে রোগটা মারাত্মক হবে, কাদের ক্ষেত্রে নয়? যদিও দেখা যায়, রোগের ভয়াবহতার পরিমাণ মহিলাদের ক্ষেত্রে খানিকটা কম। এছাড়া বাচ্চারাও খানিকটা কম আক্রান্ত। এসবকে একটা ভালো দিক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষকদের রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়- ‘বর্তমানে করোনা সংক্রমিতদের ৪০ শতাংশের ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ নেই।’ এরকম উপসর্গহীন করোনাই হয়তো আগামী দিনে ধীরে ধীরে ছড়াবে। এক সময় দেখা যাবে, করোনার বিশেষ কোনো উপসর্গই আর থাকবে না। বিজ্ঞানীরা বলেন, ‘এ হারে যদি অ্যাসিম্পট্যোম্যাটিক রোগীর (যাদের কোনো করোনা উপসর্গ নেই) সংখ্যাটা বেড়ে যায়, তবে তা ভালো লক্ষণ বটে! এর ফলে ধীরে ধীরে কমে আসবে করোনার মারণ প্রকোপ। এজন্যেই ধারণা করা হয়, ভ্যাকসিন হয়তো সবার জন্য প্রয়োজন নাও হতে পারে। সুস্থ সবল কম বয়সি মানুষ হয়তো ভ্যাকসিন ছাড়াই করোনা সংক্রমণের পর আপন মনে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।

তবে কেন ভ্যাকসিন?
ভ্যাকসিন বিশেষভাবে প্রয়োজন হতে পারে অধিকতর বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ কিংবা দুর্বল লোকদের জন্য। সবাই লক্ষণ বুঝে গেছেন, ‘ভ্যাকসিন ছাড়া করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার নয়।’ ভ্যাকসিন না বেরুনো পর্যন্ত এই মহামারীর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। সেজন্যই ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মহাযজ্ঞ চলছে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে, অনেক বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে কি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই করোনা পরিস্থিতির সবকিছু শেষ হয়ে যাবে?

জী না। একটা ভ্যাকসিন মানুষকে কতদিনই বা সংক্রমণ থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হবে? সাধারণত ভ্যাকসিনের মেয়াদ থাকে এক বছর। এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই করোনা ভ্যাকসিন প্রতিবছরই উৎপাদন করতে হবে? প্রতিবছর ভ্যাকসিন পৃথিবীর সমস্ত মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে? তাই বলা যায়, সারা বছর এমনকি যুগ যুগ ধরে ভ্যাকসিন উৎপাদনের ব্যবস্থা চলমান থাকবে। যে পর্যন্ত করোনা আপন মনে আমাদের ছেড়ে চলে না যায়। হয়তো সে কারণেই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা পরামর্শ দিচ্ছে, ‘কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও বাজারজাতকরণের আগে মানুষকে সাবধানে রেখে করোনার ছোবলকে যতটা পারা যায় ঠেকিয়ে রাখতে হবে।’ কথাটা মনে রেখে ভ্যাকসিন বেরুনোর আগ পর্যন্ত ভার্চুয়াল দুনিয়াতেই সিংহভাগ কাজ চালাতে হবে সবাইকে। এটাই সময়ের দাবি।

শেখ আনোয়ার : বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক

সূত্র: খোলাকাগজ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com

 www.bdallbanglanewspaper.com

Design & Developed BY Creative Zoone IT