রবিবার, ২৫ Jul ২০২১, ০৬:৩১ অপরাহ্ন

৭১’র ৬ ডিসেম্বরের রাতটি ছিল চুয়াডাঙ্গার জন্যে বিভীষিকাময় ধবংসযজ্ঞের

আমাদের চুয়াডাঙ্গা রিপোর্ট: হাজার বছরের ভয়াবহ ধবংস আর ভয়ঙ্কর বিভীষিকাময় ৭১’র ৬ ডিসেম্বরের দিনগত রাতটি ছিল চুয়াডাঙ্গা শহরবাসীর জন্যে বেদনা-বিধুর ঐতিহাসিক ঘটনা।
আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরের রাতের প্রথম প্রহর থেকেই তৎকালিন মহকুমা চুয়াডাঙ্গা শহরে একের পর এক সংঘটিত হয়েছিল হাজার বছরের ভয়াবহ ধবংসাত্মক আর বিভীষিকময় বেদনা-বিধুর ঘটনাবলী।
ওই রাতে ঘড়ির কাটা ৭টা ছোঁয়ার সাথে সাথে সর্বপ্রথম শহরটির বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের বড় বড় ৩টি ট্রান্সমিটার ডিনামইট/মাইন চার্জ করে উড়িয়ে দেয়া হয়। হঠাৎ করেই পর পর বিকট ৩টি শব্দে কেঁপে উঠে পুরো শহরটি। মুহূর্তের মধ্যেই ধবংসকৃত ট্রান্সমিটার পয়েন্ট এলাকায় দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে আগুনের উঁচ্চ লেলিহান শিখা। তৎকালিন মহকুমা শহর চুয়াডাঙ্গার চারপাশের ৪/৫ মাইল দূরবর্তী গ্রামগুলি থেকেও দৃশ্যমান হয়েছিল বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিটার ধবংসের আগুনের সেই আকাশচুম্বী শিশা।
এর কিছুটা সময় পর রাত পৌণে ৮টার দিকে উঁচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ডিনামাইট চার্জ করে উড়িয়ে দেয়া হয় চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর সড়কের শহীদ হাসান চত্বর সংলগ্ন মাথাভাঙ্গা নদীর উপরিস্থিত ব্রিজের পূর্বপ্রান্তের ১ম একটি আর.সি.সি স্লাব। এ ঘটনায় বিকট শব্দের সাথে সাথে বড় রকমের একটা ঝাঁকুনী সৃষ্টি হয় চুয়াডাঙ্গা শহরসহ পুরো এলাকা জুড়ে। বন্ধ হয়ে পড়ে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের মধ্যে যাতায়াত যোগাযোগ ব্যবস্থা।
আকস্মিক সৃষ্ট উল্লেখিত ওইসব ভয়াবহ ও ভয়ঙ্কর ধবংসাত্মক ঘটনায় মারাত্মক ভয়-আতঙ্কের মধ্যে নিপোতিত হয়ে পড়ে সমগ্র শহরবাসীসহ এ জনপদের মানুষ।
ঘটনার এখানেই শেষ না,Ñ রাত রাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট ক’একটি মাইন চার্জ করে ধবংস করে দেয়া হয় তৎকালিন চুয়াডাঙ্গা মহকুমা শহরের শেখপাড়াস্থ টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি। এ ঘটনার পর স্তব্ধ ও স্থবির হয়ে পড়ে চুয়াডাঙ্গার সাথে আন্তঃজেলা ও দেশী-বিদেশীসহ স্থানীয় সকল টেলি সংযোগ কর্মকাণ্ড।
এর কিছুটা সময় পর রাত প্রায় সাড়ে ৯টার দিকে আগুন লাগানো হয় তৎকালিন নব-নির্মিত (অব্যবহৃত) ৫০ আসন বিশিষ্ট চুয়াডাঙ্গা আধুনিক হাসপাতালটিতে। উল্লেখ্য, দু’তলা বিশিষ্ট এই হাসপাতাল ভবনটির বিভিন্ন কক্ষে মজুদ ছিল তৎকালিন চুয়াডাঙ্গাস্থ পাক সেনা বাহিনীর বিপুল পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী এবং অস্ত্র ও গোলা-বারুদ। ক’এক কোটি টাকা মূল্যের ওইসব খাদ্য এবং সামরিক সরঞ্জামাদি ও গোলা-বারুদ আগুনে পুড়তে থাকে রাতভর। আগুনে পুড়ে গোলা-বারুদ বিনষ্টের একটানা অনরগল ‘চটর-বটর’ শব্দ শোনা যায় রাতভর,Ñ এমনকি পরদিন ৭ ডিসেম্বর সকাল অবধি। এ ছাড়া, চাল, আটা ও গমসহ আগুন লাগিয়ে ভেজষ তেল সুয়াবিন পোড়ার গন্ধও ভেষে আসে বাতাসের সঙ্গে।
উল্লেখ্য, ওই সময় একাত্তরের শেষ লগ্নে তৎকালিন ‘বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী খ্যাত চুয়াডাঙ্গা’ ছিল পাক-হানাদার বাহিনীর সাব-রিজিউন হেড-কোয়ার্টার। উপর বর্ণিত ৫০ আসনের হাসপাতালটি (ভবনাদিসহ) ছিল পাক বাহিনীর (চুয়াডাঙ্গা সাব-রিজিউন) মজুদ সামরিক সরঞ্জামাদি ও গোলা-বারুদসহ কোটি কোটি টাকা মূল্যের খাদ্য ভাণ্ডার। আর মহকুমা শহর সংলগ্ন দৌলতদিয়াড়স্থ টেকনিক্যাল কলেজটি ছিল পাক বাহিনীর সাব-রিজিউন হেড-কোয়ার্টর। দৌলতদিয়াড়স্থ টেকনিক্যাল কলেজের ওই সাব-রিজিউন হেড-কোয়ার্টারটিতে ছিল একজন কর্ণেল’র নেতৃত্বে পাক সেনা বাহিনীর একটি শক্তিশালী ইউনিট।
আরও উল্লেখ্য, একাত্তরের বাঙালি নিধন যুদ্ধের একেবারে অন্তিমলগ্নে পরাজয় নিশ্চিত উপলদ্ধি করে পাক-হানাদার বাহিনী। এ দিন ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সূর্যোদয় থেকে সন্ধাবধি চুয়াডাঙ্গাস্থ সাব-রিজিউনের অধীন পাক-সেনা সদস্যরা স্ব-স্ব অস্ত্রাদি গুটিয়ে পরাজয়ের গ্লানিভরা মলিন মূখে চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত ছেড়ে পাকশী হার্ডিং ব্রিজের দিকে চলে যায়। ওই দিন দুপুরের লাঞ্চের পর পরই সকল সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকবৃন্দ দৌলতদিয়াড়স্থ সাব-রিজিউন হেড-কোয়ার্টার ছেড়ে যাত্রা করে পাকশী হার্ডিং ব্রিজ অভিমুখে।
সাব-রিজিউন হেড-কোয়ার্টার ছাড়ার পূর্ব মুহূর্তে পাক-হানাদার বাহিনীর একটি ডেষ্ট্রয়ী ইউনিট পরিকল্পিত ভাবে চুয়াডাঙ্গা শহরের উপর বর্ণিত ভয়ঙ্কর ও ভয়াবহ ধবংসাত্মক বর্ববরতা সৃষ্টি করে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com

 www.bdallbanglanewspaper.com

Design & Developed BY Creative Zoone IT