শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ০৪:২৭ পূর্বাহ্ন

ঈদে মিলাদুন্নবী : হৃদয়ে সুর উঠুক নবীপ্রেমের

১২ রবিউল আউয়াল পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী। কারো কারো মতে এ দিনে আমাদের হৃদয়ের বাদশা হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেছেন। তাই এ দিনটিকে অনেকে ঈদে মিলাদুন্নবী হিসেবে পালন করেন। রাষ্ট্রীয়ভাবেও এ দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়েছে।

আমাদের হৃদয়ে নবী, জীবনে নবী (সা.)। আমরা তাকে ভালোবাসি সারাক্ষণ, সারামাস, সারাবছর। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাকে ভালোবাসি। তাকে ভালোবাসার কোনো সময় নেই, স্থান নেই, নেই কোনো বাধাবিপত্তি।

তাকে ভালোবাসার জন্য প্রথম যে নিদর্শন রাসূল (সা.) নিজে বর্ণনা করে গেছেন তা হলো তার ওপর দরুদ পড়া। দরুদের মোহনায় ভেসে যাওয়া অন্যকে ভাসিয়ে দেয়া। তাকে ভালোবাসার এই নিদর্শনই অন্যসবকে ভালোবাসার অভ্যাস গড়ে তুলবে।

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) মারা গেলেন। মারা যাওয়ার কিছু দিন পর তার এক ঘনিষ্ঠ শাগরিদ তাকে স্বপ্নে দেখল। দেখার সঙ্গে সঙ্গে তাকে জিজ্ঞাস করল, হে হুজুর! আল্লাহ আপনার সঙ্গে কি ব্যবহার করেছে। উত্তরে ইমমি শাফেয়ি (রহ.) বলেন, আল্লাহ পাক আমাকে নবীজির (সা.) ওপর দরুদ পাঠ করার কারণে ক্ষমা করে দিয়েছেন। দরুদ পাঠ শুধু নবীজি (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা এমন নয়। দরুদপাঠ শ্রেষ্ঠতম নফল ইবাদতের অন্যতম।

আল্লাহ তায়ালার দরবারে যেকোনো ইবাদত ও দোয়া কবুল হতে নবীজির (সা.) ওপর দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি। দরুদ শরিফ পাঠে আল্লাহর দরবারে ইবাদতের বিনিময় সুনিশ্চিত হয়। বড় বড় বুযুর্গরা বলেন, দুরুদ আবশ্যকীয় কবুল বিষয়। একারণে বুযুর্গরা বলতে প্রত্যেক দোয়ার আগে পরে দুরুদ পড়, যেন তোমার দোয়ার আগে পড়ে আবশ্যকীয় কবুল বিষয় থাকার কারণে মাঝের দোয়াও আল্লাহ কবুল করে নেবে।

ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য পরম ভক্তি-শ্রদ্ধা ও পূর্ণ ভালোবাসার সঙ্গে নবীজির (সা.) ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। তাই প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের উচিত হজরত মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অধিক থেকে অধিক দরুদ পাঠ করা। কেননা দরুদ পড়া এমন একটি ইবাদত, যা আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই কবুল করেন। এমনকি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবের ওপর সবসময় দরুদ (রহমত বর্ষণ) পড়েন।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনুল কারিমে ঘোষণা হচ্ছে-

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

অর্থাৎ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ ও সালাম পেশ করে (অনুগ্রহ প্রার্থনা করে)। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবীর ওপর দরুদ পড় এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও’। (সূরা: আল আহজাব, আয়াত নম্বর: ৫৬)।

নবীজি (সা.) ওপর দরুদ পাঠের ফজিলত বেশ অপরিসীম। একদিন এক ব্যক্তি হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে নামাজ পড়ে এই দোয়া করল, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার সবগুনাহ ক্ষমা করে দিন এবং আমার ওপর রহমত দান করেন, তখন হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ওহে নামাজি! তোমার এতো তাড়া কিসের? খুব জলদি করেছ। শোনো, যখন তুমি নামাজ পড়বে তখন প্রথমে আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করবে। তারপর আমার ওপর দরুদ পাঠ করবে এবং পরিশেষে নিজের জন্য দোয়া করবে।’ (তিরমিজি)।

বর্ণিত ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি প্রত্যেক কাজেই আল্লাহর হামদ ও সানার ওপর রাসূলের (সা.) ওপর দরুদ পাঠ জরুরি।

হজরত কাব ইবনে ওজারা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে যে তিনি বলেন, একদিন আমরা হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ওপর আমরা কীভাবে দরুদ পাঠ করবো? তিনি বললেন, ‘বলো-

اللهم صلي علي محمد وعلي أل محمد، كما صليت علي إبراهيم وعلي أل إبراهيم إنك حميد مجيد، اللهم بارك علي محمد وعلي أل محمد كما باركت علي إبراهيم وعلي أل إبراهيم، إنك حميد مجيد

‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ; কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আ-লি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ; আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ-কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আ-লি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।’

অর্থাৎ: ‘হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার বংশধরদের ওপর এমন রহমত নাজিল করো, যেমনটি করেছিলে ইব্রাহিম (আ.) ও তার বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করো, যেমন বরকত নাজিল করেছিলে ইব্রাহিম (আ.) ও তার বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়।’ বোখারি ও মুসলিম বর্ণিত দরুদটি আমাদের সকলেরই জানা ও মুখস্থ।

এই দরুদটি আমরা প্রতিদিন প্রতি নামাজের শেষ বৈঠকে পড়ি। এখন থেকে নিয়ত করি। এটাকে প্রতিদিন সকাল দুপুর বিকেল সন্ধ্যার পাঠ্য বানিয়ে নেব। এই রবিউল আওয়াল মাসের শপথ হোক দরুদের। অভ্যাসে পরিণত হোক দরুদ পাঠ করা। যদি আমরা দুরুদের অভ্যাস গড়ে নিতে পারি তাহলে আমরা রবিউল আওয়াল পালন সফল হবে।

এই দুরুদ পাঠে আমাদের কী লাভ হবে সেই সংবাদ আমাদেরকে দিচ্ছেন নবীজি (সা.) নিজেই। নাসাই শরিফের বর্ণনায় আছে হজরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর মাত্র একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর ১০ বার রহমত নাজিল করেন এবং কমপক্ষে তার ১০টি গুনাহ মাফ করেন। তার আমলনামায় ১০টি সওয়াব লিপিবদ্ধ করেন এবং আল্লাহর দরবারে তার মর্যাদা ১০ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়।’

একই কিতাবের আরেক হাদিসে আছে নবীজি (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে, যে ব্যক্তি আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পড়ে।’ সুবহানাল্লাহ!’

এতো এতো ফজিলতের কথা শুনেও যদি আমরা দুরুদে অভ্যস্থ না হই তাহলে আমাদের এ বলা কওয়া লেখার মূল্য কী? এখন চলছে রবিউল আওয়াল। এই মাসের নবীজিকে নতুন করে ভালোবাসার পর্ব শুরু হোক।

সুর উঠুক; সাল্লাল্লাহুর আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com

 www.bdallbanglanewspaper.com

Design & Developed BY Creative Zoone IT