বুধবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২২, ০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন

মেহেরপুরে টিউবয়েলের পানিতে রোগ মুক্তির গুজুব

গোলাম মোস্তফা, গাংনীর ভবানীপুর থেকে ফিরে:

মেহেরপুুর জেলার গাংনী উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের রাহেজা খাতুন তার একমাত্র ছেলের লিভারে চর্বি জমা সহ বিভিন্ন রোগে গত ৫ বছর যাবৎ চিকিৎসকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভালো না হওয়ায় অনেকটাই হতাশশাগ্রস্থ্য। কিন্তু ছেলের এমন রোগে মা কি বসে থাকতে পারে ? তাই বিশ^াসের উপর ভর করে গ্রামের এক ফকিরের আড্ডায় টিউুবয়েলে অনবরত পানি উঠা থেকে এক বতল পানি নিয়ে বাড়ি ফিরছে যদি এই পানি খেয়ে সৃৃষ্টিকর্তা তার ছেলের রোগমুক্তি করে দেয় এই আশায়্। শুধুু রােেহজা খাতুনই না জেলা ছাড়ি অন্য জেলার হাজারও মা-বাবা, ভাই বোন ছুটে আসছে এই অলৌকিক টিউবয়েলের কুদরতি পানি নিতে।


মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সীমান্তবর্তি ভাবানিপুর গ্রাম। এই গ্রামের একটি টিউবয়েলে হাতলে চাপ বা কোন ইলেকট্রিক সংযোগ ছাড়াই নিরবিচ্ছিন্ন পানি বের হয়ে চলেছে। বিষয়টি অলৌকিক বা টিউবয়েলে থেকে নির্গত পানিতে মানুষের রোগ মুক্তি হচ্ছে বলে ওই এলাকায় গুজুব ছড়িয়ে পড়েছে। রোগ মুক্তির গুজব ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক সহ মানুষের মুখে মুখেও। বর্তমানে করোনা মহামারী সহ নানা রকম জটিল রোগ মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ যে যেভাবে পারছে ওই টিউবয়েলের পানি নিতে ছুটে যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে পানি পান করা সহ ভরে নিয়ে যাচ্ছে বোতলে করে। যারা যেতে পারছেন না তারা নিকট আত্মীয় সহ কাছের মানুষের মাধ্যমে পানি বোতলে করে বাড়ীতে আনিয়ে নিচ্ছেন। তবে ওই পানি পান করে কারো রোগ মুক্তি হয়েছে এমন কোন খবর পাওয়া যায়নি। তার পরেও নারী-পুরুষ, শিশু সহ বিভিন্ন বয়সী ও শ্রেণী পেশার মানুষ পানি নিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন মানুষ নানান মন্তব্য করেছেন।
টিউবয়েলের মালিক আনারুল ফকির (লালন ফকিরের অনুসারী) বলেন, আমার আখড়াটি মাথাভাঙ্গা নদীর সাথে। আমি কুষ্টিয়াতে ছিলাম। আমার টিউবয়েল থেকে অনবরত পানি বের হচ্ছে আর মানুষ তা বোতলে ভরে নিয়ে যাচ্ছে শুনে আজ (শুক্রবার) আখড়ায় ফিরে এসেছি। এসে দেখি শত শত মানুষ আসছে পানি নিয়ে যাচ্ছে। আমি অনেককেই জিজ্ঞাসা করলাম কারো কোন রোগ ভাল হয়েছে কিনা? কারো কোন রোগ ভাল হয়েছে বলে কেউ নিশ্চিত করেনি। সকলেই বলছেন মানুষের সাথে শুনে বা ফেসবুকে দেখে এসেছেন।
পাশ^বর্তী কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়া গ্রামের গৃহবধু আফরোজা খাতুন পানি নিতে এসে বলেন, আমি পায়ের ব্যাথার সমস্যায় ভুগছি দীর্ঘদিন ধরে। কোন ঔষধে কাজ হচ্ছেনা। লোক মুখে শুনে এই পানি নিতে এসেছি। আল্লাহ চাইলে এই পানির উছিলায় আমার রোগ ভাল হয়ে যেতে পারে।
ভবানীপুর গ্রামের কুদরত ইসলাম বলেন, মানুষ বিশ^াস করে পানি নিয়ে যাচ্ছে তাই আমরা নিষেধ করতে পারছি না। এখানে কোন টাকা পয়সা লেনদেন বা আইন শৃংখলার অবনতি হবার শঙ্কা থাকলে, আইনশৃংখলা বাহীনিকে বল্লে তারাই এটা বন্ধ করে দিতেন। মানুষের বিশ^াসকে অমর্যাদা করি কিভাবে?


গাংনী সরকারী ডিগ্রি কলেজের ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক (অবঃ) এনামুল আযীম বলেন, সাধারণত বর্ষার সময় পানির লেয়ার উপরে উঠে যায়। সে সময় লেয়ারটি যদি বাঁকা বা আর্টিজান কুপের সৃষ্টি হয় আর সেই স্থলের মধ্য দিয়ে টিউবয়েলের পাইপ থাকলে অনবরত পানি উঠতে থাকবে। পানির লেয়ার নিচে নেমে না যাওয়া অব্দি পানি বের হতে থাকবে। এমন ঘটনা অস্ট্রেলিয়াতে প্রাই হয়ে থাকে। ভূগর্ভস্থ পানি টিউবয়েলের মুখ দিয়ে বের হতে থাকা এটা একটি প্রাকৃতিক নিয়ম। নতুন কিছু নয়। সমতল ভূমিতে কম হওয়ায় আমাদের এলাকায় এটা নতুন বলে মনে হচ্ছে। মানুষের মাঝে উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশেও গ্যাসের চাপের কারনে টিউবয়েলে বা নানা ধরনের জলাশয়ের গর্ত দিয়ে গ্যাস বা পানির বুদ বুদ উঠার খবর দেখতে পাই।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ মাহবুবুল আলম বিপ্লব বলেন, এক পানিতেই সকল রোগের মুক্তি মিলবে এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। মানুষের নানান ধরনের রোগ হয়। রোগের ধরণ বা উপসর্গ বুঝে তাদের ব্যাবস্থাপত্র ও ঔষধ দেওয়া হয়। তাতেই রোগ সারে। পানি খেয়ে অসুখ সারে এটা গুজুব। এটা চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোন ভিত্তি নাই।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি