রবিবার, ২৫ Jul ২০২১, ০৮:৪০ অপরাহ্ন

দেশের উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

ডেস্ক রিপোর্ট দৈনিক আমাদের চুয়াডাঙ্গা ডটকম

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। গতকাল শনিবার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, নাটোর, সিলেট, সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোনা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। অপরদিকে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদনদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে, যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। সারা দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে

কুড়িগ্রাম : অস্বাভাবিকভাবে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমারসহ ১৬টি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ধরলা ও তিস্তার পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দ্রুতগতিতে বাড়ছে ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানিও। আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলছে জরুরি সভাও। প্রথম দফা বন্যার রেশ কাটতে না কাটতেই দ্বিতীয় দফা বন্যার কবলে পড়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চরাঞ্চলসহ নদ-নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী লোকজন।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তার পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলায় ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়া এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের হুমকিতে                 পড়েছে।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। আমরা জেলা ও সব উপজেলার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে প্রস্তুত করে রেখেছি। বন্যায় যখন যা প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে তাই করা হবে।

গঙ্গাচড়া (রংপুর) : উজানের ঢল ও ভারী বর্ষণে তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। শনিবার দুপুরে তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। এতে করে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চরাঞ্চলের প্রায় ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গঙ্গাচড়ার কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা গ্রামে একটি উপ-বাঁধের একশ ফুট ভেঙে গেছে। এতে করে প্রায় ১৭শ’ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

গজঘণ্টা ইউনিয়নের ছালাপাক, জয়দেব, রাজবল্লভের কিছু অংশ নদীর পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ফলে ইউনিয়নের ৫’শ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। মর্ণেয়া ইউনিয়নের চর মর্ণেয়া, নীলারপার এলাকার ১ হাজার পরিবার, নোহালী ইউনিয়নের চর বাগডোহরা, চর নোহালী, বৈরাতি’র প্রায় ২ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

এছাড়া বন্যায় ফসলী ক্ষেত, ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। অনেকে তিস্তা নদীর বাঁধে গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যায় ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

এদিকে শনিবার বন্যায় প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাসলীমা বেগম।

ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) : ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নতুন করে বৃদ্ধি পেতে শুরু করায় আবারও বন্যার আশঙ্কায় রয়েছেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় বসবাসকারী দুই লক্ষাধিক মানুষ। পূর্বাভাস অনুযায়ী ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হলে চরম দুর্ভোগে পড়বেন এ উপজেলার খেটে খাওয়া মানুষগুলো। এদিকে পানি বৃদ্ধি পেলে ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীর ঘেঁষা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি চরম হুমকির মুখে পড়বে। স্থানীয়দের দাবি, এখনই বাঁধটিতে কাজ করা হলে বড় ধরনের বন্যা হলেও ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে। এতে করে বাঁধের পশ্চিম পার্শ্বে ফুলছড়ি উপজেলা প্রশাসনিক ভবন সহ কয়েক লক্ষাধিক মানুষের জানমাল রক্ষা হবে।

ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু রায়হান দোলন বলেন, বন্যার স্থায়িত্ব ও ভয়াবহতা উপলব্ধি করে উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী মজুদ রাখা হয়েছে। এছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি রক্ষায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।

লালমনিরহাট : টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি আবারও বাড়ছে। ফলে জেলার আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও সদর উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফের বন্যার আশঙ্কা করছে নদী পাড়ের মানুষ। এদিকে ধরলার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর জানান, জেলায় ১৭ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ত্রাণের কোনো সমস্যা হবে না। পর্যাপ্ত ত্রাণ রয়েছে।

আদিতমারী (লালমনিরহাট) : লালমনিরহাট আদিতমারীতে তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফলে সেখানকার মানুষগুলো শুকনা খাবার ও গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে। তাদের ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় তারা এখন মানবেতার মধ্যে জীবনযাপন করছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মফিজুল ইসলাম জানান, তিস্তা নদীর পানিবন্দি মহিষখোচা ইউনিয়নের ৭টি ওয়ার্ডের ৫ হাজার পরিবার এবং পলাশী ইউনিয়নের মহিষাশহর ১টি ওয়ার্ডে ৬ শত পরিবারের পানিবন্দি পরিবারে তালিকা প্রণয়ন করে শুকনা খাবার ও অন্যান্য ত্রাণ সামগ্রী চাহিদা চেয়ে জেলা প্রশাসক বরাবারে প্রেরন করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডোমার (নীলফামারী) : উজানের পাহাড়ী ঢলে তিস্তা নদীর পানি চতুর্থ দফায় আবারও বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শনিবার সকাল ৬টা থেকে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বেড়ে যাওয়ায় তিস্তা চরবেষ্টিত গ্রামগুলোর প্রায় ৫ হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে।

এদিকে কিছামত ছাতনাই, ঝাড়সিঙ্গেশ্বর, চড়খড়িবাড়ী, পূর্ব খড়িবাড়ী, পশ্চিম খড়িবাড়ী, তিস্তা বাজার, বাইশপুকুর, ছাতুনামা, ভেন্ডাবাড়ি এলাকার পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় সেখানকার মানুষ ও গবাদি পশুদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল লতীফ জানান ভারতের গজলডোবা থেকে হু হু করে পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এতে করে পরিস্থিতি ভয়ংকর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিবন্দী হয়ে পরেছে অনেক পরিবার।

ডিমলা (নীলফামারী) : নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের সাড়ে ছয় হাজার পরিবারের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে । অনেক পরিবার পানি উন্নয়ন বের্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেরার বেশিরভাগ ইউনিয়নের হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় বন্যা এলাকার পানিবন্দি এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে বন্যা কবলিত এলাকা স্বরেজমিনে পরিদর্শনসহ সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে সার্বক্ষনিক খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। আমরা বন্যার্তদের পাশে রয়েছি।

সুনামগঞ্জ : দফায় দফায় বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে পুরো জেলা। একদিকে করোনা আর অন্যদিকে বন্যা। বিপদ পিছু ছাড়ছে না দেশের সীমান্তিক হাওর অধ্যুষিত জেলা সুনামগঞ্জকে। করোনার এমন ভয়াবহতার মধ্যে পর পর বন্যা যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সপ্তাহের মাথায় দুই বার বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে এই জেলায়। পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টিতে সুরাম নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সরমার পানি উপছে প্লাবিত হয়েছে সুনামগঞ্জ শহরসহ জেলার নি¤œাঞ্চল। সুনামগঞ্জের সদর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারবাজার , ছাতক, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন লাখো মানুষ। দ্বিতীয় ধাপে আবারও ৫০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সুরাম নদীর বিপৎসীমা ৭.৮০ সেন্টিমিটার থাকলেও টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ী ঢলে শনিবার দুপুর পর্যন্ত বন্যার পানি বিপৎসীমার ৫৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৩৩ মিলিমিটার। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ না বাড়লে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান।

এদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয় কেন্দ্র ও কন্টোল রুম খোলা হয়েছে। বন্যার্তদের আশ্রয় কেন্দ্রে উঠার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে বন্যায় ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। জরুরী ভিত্তি ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ।

দেশের ২৩টি জেলার মানুষ বন্যাকবলিত হতে পারে বলে ইতোমধ্যে আভাস দিয়েছে সরকার। এসব অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্যার্তদের জন্য প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বন্যাদুর্গত এলাকায়।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 DailyAmaderChuadanga.com

 www.bdallbanglanewspaper.com

Design & Developed BY Creative Zoone IT